প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনা মহানগরীতে সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমের দুই হাতের কবজিতে চাপাতি দিয়ে গুরুতর আঘাত করে। ৯ অক্টোবর খুলনা জেলার সদর থানাধীন কলেজিয়েট স্কুলের সামনে রিকশায় পুলিশ ক্লাবে যাওয়ার সময় তিনি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। গতকাল শুক্রবার কুমিল্লায় সালিশে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা যুবদল নেতা আবু কাউসারকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে তার বাড়ির মাত্র ৫০ গজ দূরে চায়ের দোকানে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
সারাদেশে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। পুলিশ, সরকারি দলের নেতা-কর্মী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ আজ টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। খুনের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধ দমনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানের পরও পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। হত্যাসহ বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-পুলিশ সদর দফতরের পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। শীর্ষ কর্মকর্তারা যেন ঘুমের মধ্যে রয়েছেন। এ অবস্থায় অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চলতি বছরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৫ জনেরও বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থা ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, গণপিটুনির সংস্কৃতি, রাজনৈতিক কোন্দল এবং পারিবারিক অস্থিরতার কারণে এ ধরনের নৃশংস খুনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যদিও বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বৈঠকে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করা হয়। পরিসংখ্যানে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, দাঙ্গা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে অপরাধ, মাদকদ্রব্য এবং চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য ছিল। বৈঠকে সারা দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়। অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সময়োপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেন কমিটির সদস্যরা।
গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। নিহতের ভাই আব্দুল জলিল সানা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগ’ তুলে গণপিটুনি বা মব জাস্টিসের মাধ্যমে শামীমকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। চলতি মাসে সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কুমিল্লায় জান্নাতুল তাজমীন (১৩) হত্যাকাণ্ড। ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমীনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনাস্থলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে অটোরিকশাটির চালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে। ৭ অক্টোবর পটুয়াখালী ইপিজেড মাঠে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের হাতাহাতির জের ধরে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে আব্বাস ও তার চাচাতো ভাই রুবেল সিকদারকে ডেকে নেয়া হয়। পরে কৌশল অবলম্বন করে রুবেলকে ছেড়ে দেওয়া হলেও আব্বাসকে আটকে রাখা হয়। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। ৯ অক্টোবর রাতে পটুয়াখালী সদর থানাধীন পশ্চিম আউলিয়াপুর এলাকায় ইপিজেড সংলগ্ন মহাসড়কের পাশের ঢাল থেকে আব্বাসের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে শিরিন বেগমের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীর চার টুকরা করে রাখা হয়েছিল।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে সহিংসতার ব্যাপক চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৬৯টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও অন্তত ৫৪০ জন আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩১টি ঘটনায় একজন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৬টি ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনও পুরোপুরি কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিগত শাসনামলে পুলিশের ব্যবহার এবং তা নিয়ে জনঅসন্তোষ বাহিনীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কার্যকর পুলিশিংয়ে ফেরাতে আরও সময় প্রয়োজন। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেক অপরাধী পালিয়ে বা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের ধরার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব প্রতিপত্তি বিবেচনায় না নিয়ে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা বাধার মুখে পড়ে। কোনও ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অন্য ঘটনায় শিথিলতা দেখানো হলে আইনের শাসনের ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধী যেই হোক, তদন্ত, অভিযোগপত্র ও বিচার প্রক্রিয়ায় সমান মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ চলতে থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন