প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানীর হাজারীবাগের বউবাজার জিগাতলা এলাকায়, ৪৭/৩ বি সোনাতনগড় ঠিকানায় ‘মেসার্স বরিশাল ফার্মেসী’ নামে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন গিয়াস উদ্দিন মিয়া নামের এক ব্যক্তি, যাঁর নেই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কোনো নিবন্ধন বা স্বীকৃত চিকিৎসা সনদ। একটি ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেই নিজের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করে নিয়মিত রোগীদের প্রেসক্রিপশন দিয়ে আসছেন তিনি — যা বিএমডিসির নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফার্মেসিতে তার চেম্বারে রোগীদের ভিড় লেগেই আছে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী দেখেন, প্রতি ভিজিটে ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে নেন। যুগান্তরের হাতে আসা তার একটি প্রেসক্রিপশনে দেখা যায়, সেখানে তিনি নিজেকে ডি.এম.এফ (ঢাকা), বি.এইচ.এস (স্বাস্থ্য), ডি.আই.এম.এস (ঢাকা)-সহ শিশু ও স্ত্রীরোগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। প্রেসক্রিপশনে ঠিকানা ও রোগী দেখার সময়ও (সকাল ৯টা–১টা, বিকাল ৫টা–১০টা) উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগের মুখোমুখি হলে গিয়াস উদ্দিন স্বীকার করেন, ১৯৮২ সালে মহাখালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একটি ডিপ্লোমা করেছিলেন এবং সেই থেকেই তিনি এই পেশায় যুক্ত। তিনি বলেন, তার ডাক্তারি নিয়ে আদালতে একটি প্রক্রিয়া চলছে এবং শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসবে। নিজেকে ‘গরিবের ডাক্তার’ দাবি করে তিনি বলেন, তিনি মানুষের উপকারই করছেন। তবে একপর্যায়ে স্বীকার করেন, তার এই ডিপ্লোমা দিয়ে আইনগতভাবে চিকিৎসা দেওয়া বা প্রেসক্রিপশন লেখার অধিকার তার নেই। পরে প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হয়ে তিনি হুমকি দেন, ‘আমার ভাই বিচারপতি। নিউজ করার আগে সাবধান!’
এই ফার্মেসিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাই এই প্রতারণার প্রধান শিকার। আবু সায়েম নামের এক রোগী যুগান্তরকে বলেন, এলাকার মানুষ তাকে ভালো ডাক্তার মনে করে বলেই তিনি চিকিৎসা নিতে এসেছেন; এর আগে হাজারীবাগের মুক্তি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে তার কাছ থেকেই ওষুধ নিয়েছেন তিনি।
সারা শরীরে লালচে ছোপ ও প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে আসা ১০ বছর বয়সী ফাতেমা আক্তারের বাবা বলেন, মেয়ের অসুস্থতা দেখে প্রতিবেশীদের পরামর্শেই তিনি এখানে এসেছেন। নিরক্ষর হওয়ায় ডাক্তার প্রকৃত না ভুয়া, তা যাচাইয়ের সুযোগ তার নেই — সবাই দেখায় বলেই তিনিও ভরসা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৈধ সনদ না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন গিয়াস উদ্দিন, এবং ভুল চিকিৎসায় কোনো ক্ষতি হলেও তার ‘বিচারপতি ভাই’-এর ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না বলে তাদের অভিযোগ।
এ বিষয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর মহাসচিব ডা. মোঃ জহিরুল ইসলাম শাকিল যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সুনির্দিষ্ট সনদ ও বৈধ নিবন্ধন ব্যতীত চিকিৎসা প্রদান কিংবা নামের আগে 'ডাক্তার' পদবি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। বিএমডিসির অনুমোদনহীন ভুয়া ডিগ্রি ও মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কেবল প্রতারণাই নয়, আইনগতভাবে গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের প্রতারক চক্র দেশের সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জনস্বার্থে এই ভুয়া ডাক্তার ও তাদের পেছনের চক্রটির বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে বিএমডিসি এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন