প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সমাজের কুসংস্কার, বিধিনিষেধ ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন টাঙ্গাইলের কালিহাতীর একদল নারী। তারা দুর্গাপূজার প্রায় সমস্ত আয়োজনই করছেন, যা চাঁদা সংগ্রহ, বাজার করা, মণ্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে ঢাক বাজানো অন্তর্ভুক্ত করে।
এটি একটি ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজা, যা ‘উজ্জয়িনী’ নামের একটি নারী সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপজেলার মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ায়।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মগড়া গ্রামের এই পূজামণ্ডপটি এ বছর ১১তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। যদিও নারীরা পূজার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করেছেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করছেন একজন পুরোহিত।
সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে। সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্য ও নানা বিধিনিষেধের প্রতিবাদ জানাতে চার নারী সদস্য মিলে ‘উজ্জয়িনী’ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে সংগঠনটিতে যুক্ত হন গ্রামের সাধারণ নারী ও শিক্ষার্থীরা।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সীমা কর্মকার (৪২) জানান, একসময় গ্রামের হিন্দু নারীদের পরিবার ও সমাজে নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হতো। ঘোমটা ছাড়া বাইরে বের হওয়া থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের বাধার সম্মুখীন হতে হতো।
নিজেদের পথচলার স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘২০০২ সালে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির সময় আমাকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। তখন গ্রামে নতুন আসা বধূ সীমা কর্মকার (৪৮), শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকারকে নিয়ে আমরা চারজন মিলে “উজ্জয়িনী” গড়ে তুলি। পরে সাধারণ নারী ও শিক্ষার্থীরা যুক্ত হন। ২০১৬ সালে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সিদ্ধান্ত নিই, পূজার যাবতীয় কাজ আমরা নারীরাই করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৬ সালে প্রথমবার নারীদের উদ্যোগে পূজার আয়োজন করে আমরা সফল হই। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। এবার আমাদের আয়োজনের ১১তম বছর।’
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ার পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, উৎসবমুখর পরিবেশে অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি শেষে নারীরা মণ্ডপে অবস্থান করছেন। দেবী দুর্গার দর্শনে আসছেন দর্শনার্থীরা। অন্যদিকে, সংগঠনের নারী সদস্যদের একজন নিজেই সানন্দে ঢাক বাজাচ্ছেন। পূজার আয়োজন ঘিরে সদস্যদের মধ্যে দেখা যায় উৎসাহ-উদ্দীপনা।
নারীদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা উজ্জয়িনী সংগঠনের সব সদস্যকে শুভেচ্ছা শাড়ি উপহার দিয়েছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার বলেন, এ বছর টাঙ্গাইল জেলায় ১ হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে কালিহাতীর মগড়া গ্রামের এই মণ্ডপটি জেলার একমাত্র নারীদের পরিচালিত ব্যতিক্রমী আয়োজন। নারীদের স্বাবলম্বিতা ও সাহসী উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ এর আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পূজা কমিটিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
পূজা কমিটির সভাপতি সীমা কর্মকার (৪৮) বলেন, ‘পূজার সব কাজ আমরা নারীরাই করি, শুধু পুরুষ পুরোহিত পূজা করেন। আমাদের সদস্যরা সবাই পূজার জন্য চাঁদা দিই। শুরুতে অনেকেই আমাদের এই আয়োজনকে ভালো চোখে দেখতেন না। এখন সবাই সহযোগিতা করেন।’
নারীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পূজামণ্ডপ এখন শুধু ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন নয়, বরং সমাজে নারীর সমঅধিকার, আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। নিজেদের উদ্যোগে পূজার সব আয়োজন সম্পন্ন করে প্রচলিত সামাজিক বাধা ভেঙে এগিয়ে চলেছেন উজ্জয়িনীর সদস্যরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন