প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মাতাব্বরহাট ও মতিরহাট খেয়াঘাটের নিয়ন্ত্রণ ও ইজারা নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে, বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে এবং তাঁদের নাম ভাঙিয়ে ইজারাদার মোহাম্মদ মুক্তার হোসেন ঘাটটিতে একচ্ছত্র অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ ও মাঝিমাল্লাদের চরম ক্ষুব্ধ অবস্থার কারণে ইজারাদারের নানাবিধ অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং ইজারা শর্ত ভঙ্গের কারণে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ মুক্তার হোসেন একটি দোকান পরিচালনা করার সুবাদে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এই কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে তিনি ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য ১০% মূল্য বৃদ্ধি হারে এই আন্তঃবিভাগীয় খেয়াঘাটের ইজারা নেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও জেলা পরিষদের চুক্তিপত্র অনুযায়ী, ঘাটটি কোনোভাবেই তৃতীয় পক্ষের কাছে ভাড়া বা হস্তান্তর করা যাবে না। কিন্তু সরকারি এই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইজারাদার মুক্তার হোসেন ঘাটটি অন্য একজনের কাছে ২২ লক্ষ টাকায় বিক্রি বা উপ-ইজারা দিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এই বিষয়ে ইজারাদার মোহাম্মদ মুক্তার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি অকপটে নিয়ম লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করে বলেন, "বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আমাকে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য এই ঘাট ভাড়া দিয়েছেন।" তিনি আরও বলেন, "যার কাছে ঘাট হস্তান্তর করেছি, তিনি আমাকে ১২ লক্ষ টাকা দিলেও এখনো বাকি টাকা পরিশোধ করেননি।" সরকারী নিয়ম-নীতির প্রসঙ্গে তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, "এগুলো কেবল কাগজেই হয়। আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে।" চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ এবং নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত ও ফিটনেস সার্টিফিকেটধারী ৪টি করে মোট ৮টি যাত্রীবাহী নৌযান থাকার কথা। প্রতিটি নৌযানের গায়ে নাম লেখা এবং কমপক্ষে ২ জন করে দক্ষ মাঝিমাল্লা বা সারেং থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মাতাব্বরহাট খেয়াঘাটে কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না। বর্তমানে মোট তিনটি ছোট এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌকাই আন্তঃবিভাগ পারাপারের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
যাত্রী উঠানামার জন্য ঘাটে নেই কোনো সিঁড়ি কিংবা জেটি। বর্ষার এই মৌসুমে নদী উত্তাল থাকার সময়েও বিআইডব্লিউটিএ-এর সংকেত অমান্য করে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নৌকাগুলো চলছে। একেকটি ছোট নৌকায় বর্তমানে ২০-৩০ জন যাত্রী, ৫০টিরও বেশি দুধের ক্যান (প্রতি ক্যান ৫০ লিটার) এবং প্রচুর মালামাল বোঝাই করে মাঝেরচর, ভোলা, মদনপুর কিংবা বাঘারহাটের উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছেড়ে যাচ্ছে। নৌকায় যাওয়ার জন্য যাত্রী জামাল উদ্দিন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, "আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নদী পার হই। নৌকায় ওঠার কোনো সিঁড়ি নেই, কাদা-পানি ভেঙে উঠতে হয়।" বাইরের অবস্থা খুবই খারাপ; ঘাটে কোনো গণশৌচাগার বা যাত্রী ছাউনি নেই এবং চারপাশ মল-মূত্র আর আবর্জনায় সয়লাব হয়ে আছে। নিয়ম অনুযায়ী ঘাটে কোনো নৌযান চলাচল করবে তার তালিকা জেলা পরিষদে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও মুক্তার হোসেন তা করেননি। অভিযোগ রয়েছে যে, জেলা পরিষদের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সাথে আঁতাত করে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে আসছে। অনুসন্ধানী দল জেলা পরিষদে এই আন্তঃবিভাগীয় খেয়াঘাটের নথি তলব করার সময় সেখানে কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখতে এক মাসের সময় চেয়েছে। অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটিএ-এর পরিবহন পরিদর্শক আব্দুর রহমান জানান, "বর্ষার সংকেত চলাকালীন সময়েও এই ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানগুলো দিয়ে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে।" তিনি বলেন, "আমরা বহুবার নিষেধ করা এবং সতর্ক করার পরেও ইজারাদার পক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।" দ্বৈত কর্তৃত্ব, ইজারাদারের খামখেয়ালিপনা এবং প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার নীরবতায় মাতাব্বরহাট খেয়াঘাটটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক 'মৃত্যুফাঁদে' পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল এই অবৈধ ঘাট বিক্রি বন্ধ এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন