প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একসময় রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলোর মধ্যে একটি ছিল। ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিপণিবিতানে নামী ব্র্যান্ডের শোরুম, পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রীর দোকান ছিল। এখানে ফুড কোর্ট এবং বাগানও ছিল।
কিন্তু ক্রমশ ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় একের পর এক দোকান বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে টানা লোকসান এবং পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে না পেরে কর্তৃপক্ষ চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি এক দশকের বেশি সময় ধরে ব্যবসায়িক গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে। শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন, করোনাকালে ব্যবসায়িক মন্দা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং ক্রেতাদের আস্থার সংকট—এসব কারণে বিপণিবিতানটি পিছিয়ে পড়ে। অনলাইন কেনাকাটার প্রসার এবং বড় শপিং মলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারার বিষয়টিও এতে যুক্ত হয়েছে।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির ২০ তলা ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছিল। উপরের তলাগুলো আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চালুর সময় বিপণিবিতানটিতে ১৯৮টি দোকান ছিল, কিন্তু বন্ধ ঘোষণার সময় মাত্র ১৭টি দোকান চালু ছিল। ক্রেতাসংকটে অধিকাংশ দোকান আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী বলেন, "ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় থেকেই বিপণিবিতানটির ব্যবসায়িক পতন শুরু হয়।" তিনি জানান, ২০১৬-১৭ সালের দিকে নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের সড়কে যানজট, ধুলাবালি ও চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়। তখন বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অন্য মার্কেটে চলে যান এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তারা আর ফিরে আসেননি।
তিনি আরও বলেন, "করোনাকালে ব্যবসায় বড় ধস নামে।" অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে দেন। অনলাইনে কেনাকাটা বাড়ার কারণে ক্রেতারা আগের মতো মার্কেটে আসছেন না। এছাড়া, এই বিপণিবিতানে পণ্যের বৈচিত্র্যও কম ছিল। ফলে ক্রেতাদের আগ্রহ কমতে থাকে।
বাকী বিল্লাহ ওসমানী জানান, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি চালু রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো। তিনি বলেন, "গত ছয় মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি পাওয়া যায়নি।" এই অবস্থায় সমিতির কর্মকর্তা ও কয়েকজন দোকানমালিক ঋণ নিয়ে ছয় থেকে আট মাস বিপণিবিতানটি চালু রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচের বকেয়া বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তথ্য অনুযায়ী, বিপণিবিতানটির বিদ্যুৎ বিল ৬০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিনের লোকসান ও পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় দোকানমালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক পতনের পেছনে পণ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের পণ্য বিদেশি বা নামী ব্র্যান্ডের বলে বিক্রি করতেন। এতে বিপণিবিতানটির প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়।
অন্যদিকে, ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক কেনাকাটার বিস্তার এবং বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিং মলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ব্যবসায়িক সংকট আরো বাড়িয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারাও বিপণিবিতানটির পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হলেও ভবনটির ওপরের তলাগুলোর আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টগুলো চালু রয়েছে। বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধু বিপণিবিতানের বাণিজ্যিক অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে নির্মিত এই বিপণিবিতানের অধিকাংশ দোকান আগেই ব্যক্তিমালিকানায় নিবন্ধন করে বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে ভবনটি বিক্রি অথবা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে ভাবছেন মালিকেরা। গত দুই বছর ধরে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান খোঁজার চেষ্টা করেও সফল হননি তারা।
একসময় রাজধানীর অভিজাত কেনাকাটার অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বন্ধ হয়ে যাওয়া নগরীর পরিবর্তিত ব্যবসায়িক বাস্তবতারও প্রতিফলন। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তন, অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার, প্রতিযোগিতা এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে প্রতিষ্ঠিত বিপণিবিতানও যে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাতে পারে, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পরিণতি তারই উদাহরণ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন