প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইউটিউবে দেখা একটি ভিডিও ছিল তার শখের যাত্রার শুরু। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একসময় এটি রূপ নেয় একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগে। ধান কাটার পর পড়ে থাকা জমিতে এখন মাচায় ঝুলছে সারি সারি হলুদ তরমুজ।
এটি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলমের গল্প। তার ইচ্ছা, সাহস এবং পরিশ্রমের ফলে পতিত জমিও এখন আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
উদ্যোক্তা সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ ও সংবাদকর্মী খোর্শেদ আলম প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষের একটি ভিডিও দেখেন। সেই সময় থেকেই ভিন্নধর্মী এই ফলচাষের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালে তিনি মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে হলুদ তরমুজের চাষ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেন।
প্রথমদিকে তার উদ্দেশ্য ছিল পারিবারিক চাহিদা মেটানো। কিন্তু ফলন ভালো হওয়া এবং বাজারে চাহিদা দেখে তার ভাবনা বদলে যায়। খোর্শেদ আলম বলেন, “ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষ দেখে শখ জাগে। ভাবলাম, একবার পরীক্ষা করে দেখি। ছয় শতাংশ জমিতে বীজ বপন করলাম। ফলন ভালো হওয়ার পর দেখলাম এর চাহিদাও বেশ। তখন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে চাষের চিন্তা করি।”
তিনি জানান, সেই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এবার রূপ নিয়েছে বড় পরিসরে। নিজের প্রায় তিন বিঘা পতিত জমিতে ল্যানফে, সূর্যডিম, সানগোল্ড, লিয়োনা, রবি, সাম্মাম মার্লিন ও হ্যানিডিউ মেলন জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করছেন তিনি।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জুড়ীর সহযোগিতায় ডোমাবাড়ি কচুরগুল ব্লকের ৩৩ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই চাষ শুরু করেন খোর্শেদ।
সরেজমিন শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ডোমাবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জমিতে প্রশস্ত মাচা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সবুজ পাতার ফাঁকে সারি সারি ঝুলছে হলুদ তরমুজ। মাটির ওপর বিছিয়ে থাকা লতাগুল্মের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে বাহারি হলুদ তরমুজ। বাগানের চারপাশে উৎসুক মানুষের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
কেউ তরমুজ দেখতে আসছেন, কেউ ছবি তুলছেন। কেউ পরিবারে জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ১০-১৫টি করে। অনেকের জন্য এটি প্রথমবারের মতো হলুদ তরমুজ দেখা ও খাওয়ার অভিজ্ঞতা।
কমলগঞ্জ থেকে বাগান দেখতে আসা এম এ ওয়াহিদ রুলু বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। এত দূর থেকে এসেছি উদ্যোক্তাকে উৎসাহ দিতে। তরুণ বয়সে এমন উদ্যোগ সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।”
খোর্শেদ আলম জানান, হলুদ তরমুজ শীত মৌসুমের ফসল। চাষের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে চাষে তার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভালো ফলন হওয়ায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি।
গত বছরের অভিজ্ঞতাও খোর্শেদকে উৎসাহিত করে। তার মতে, গত মৌসুমে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে তরমুজ চাষ করে প্রায় আট লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের একটি ফসল থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়েছে।
খোর্শেদ বলেন, “জুড়ীর আবহাওয়া হলুদ তরমুজ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। মাত্র তিন মাসে ফলন পাওয়া যায়। আমি মনে করি, এই এলাকায় আরও বড় পরিসরে চাষের সুযোগ রয়েছে।”
খোর্শেদের চোখে শুধুমাত্র নিজের লাভের হিসাব নেই। তার মতে, জুড়ী উপজেলায় এখনও হাজার হাজার বিঘা জমি বিভিন্ন কারণে পতিত রয়েছে। এসব জমি কাজে লাগাতে পারলে একদিকে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ জুড়ীতে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিন শত শত কৃষক ও দর্শনার্থী বাগানটি দেখতে আসছেন। তিনি বলেন, “ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ একটি উচ্চমূল্যের উচ্চ ফলনশীল জাত।
কৃষি কর্মকর্তা জানান, উৎপাদন পদ্ধতি অনেকটা দেশি তরমুজের মতো। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ ও সি রয়েছে এবং ফলটি বেশ মিষ্টি। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া এ জাতের তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী।”
কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সহযোগিতাকে এই সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, “তরুণ বেকাররা আগ্রহী হলে কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।”
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন