প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভেনেজুয়েলায় বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় জনজীবন ক্রমাগত বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং জরুরি সেবায় বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিততা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন শহরে এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশটির কারাবোবো রাজ্যের ভ্যালেন্সিয়ায় ৩৪ বছর বয়সী অনাসিস মুনোজ সপ্তাহে তিনবার কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে যান। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে তার চিকিৎসা একাধিকবার ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিদিন প্রায় সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। ক্লিনিকের জরুরি ব্যাটারির মজুত শেষ হয়ে গেছে এবং বিকল্প জেনারেটরও কাজ করছে না।
মুনোজ বলেন, "বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ায় আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।" বাড়ি ফেরার পরও অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। গরম ও মশার কারণে বিশ্রাম নেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের বিরুদ্ধে মানুষ ‘কাসেরোলাজোস’ নামে পরিচিত বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। এই ধরনের প্রতিবাদে মানুষ হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে এবং রাস্তায় টায়ারে আগুনও দিয়েছেন।
আনোভা পলিসি রিসার্চের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলার ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার প্রতিদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্মুখীন হবে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার সরকার জলবায়ু পরিস্থিতি এবং এল নিনোর প্রভাবকে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত হওয়ায় অতিরিক্ত তাপ ও খরার মতো পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নেলসন হার্নান্দেজের মতে, শুধুমাত্র জলবায়ু পরিস্থিতি দিয়ে চলমান সংকট ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তার দাবি, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব এবং পুরোনো প্রযুক্তি সংকটকে আরও গভীর করেছে।
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের পরিবর্তনও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন হার্নান্দেজ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুতের অধিকারী দেশটি সম্প্রতি তেল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ২৪ হাজার ব্যারেল। আগস্টে তা বেড়ে ১২ লাখ ১ হাজার ব্যারেলে দাঁড়ায়, অর্থাৎ এ সময়ে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
হার্নান্দেজের মতে, তেলক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঘাটতির বড় অংশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ওপর গিয়ে পড়ছে। তার হিসাব অনুযায়ী, তেল উত্তোলন, পাম্পিং, পরিবহন ও পরিশোধন কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে।
তবে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সরকার জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে কাজ চলছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে আরও ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে নিজেদের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র সংস্কার এবং স্থানীয় ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু ব্যবসা ও উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। কারাবোবোর নাগুয়ানাগুয়া এলাকার বেকারি ব্যবসায়ী ম্যানুয়েল রেয়েস জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় নিয়মিত উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক দিন বিদ্যুৎ থাকার সময় কাজে লাগাতে তাদের মধ্যরাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হয়।
বিভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের মানসিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আরাগুয়া রাজ্যের মারাকে শহরের বাসিন্দা মাইলেইদি ব্লাঙ্কো প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে উঠে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই পরিবারের খাবার প্রস্তুত করেন।
তার ছয় বছর বয়সী মেয়েও বিদ্যুৎ সংকটে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে বলে জানান ব্লাঙ্কো। একদিন মেয়ের স্কুলে, পরে বাড়িতে এবং এরপর নাচের ক্লাসে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর শিশুটি কান্নায় ভেঙে পড়ে। বিদ্যুৎ কখন আসবে এবং এই পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে, তা জানতে চেয়ে সে বারবার প্রশ্ন করতে থাকে।
বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়ার মধ্যে বিক্ষোভও অব্যাহত রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন শুধু জনজীবনের সংকট নয়, ক্রমেই বড় সামাজিক অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠছে। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন