প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে কানাডার মধ্যে। মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে মার্কিন পণ্যের ওপর কানাডার আরোপিত পাল্টা শুল্ক। তবে দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনও বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
কানাডার নতুন পাল্টা শুল্কের আওতায় আসছে প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার (প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের মার্কিন পণ্য। ইস্পাত, আসবাবপত্র ও তুলার টি-শার্টসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর এসব শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।
তবে, তালিকায় থাকা তাজা মাছ ও লবস্টারের ওপর শুল্ক আরোপ থেকে কানাডা পরে সরে এসেছে। দেশটির সামুদ্রিক খাদ্যশিল্পের তীব্র আপত্তির পর এসব পণ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কানাডাকে সতর্কভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
আলোচনা ফের শুরুর উদ্যোগ নেই
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কর্মকর্তারা উভয়েই বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে আগস্টের শেষ দিকে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর তা আবার শুরু করার বিষয়ে এখনও কোনও অগ্রগতি হয়নি।
গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘টেকসই’ চুক্তি চায় তার দেশ, যা উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে।
কার্নি বলেন, “আমেরিকানরা প্রস্তুত হলেই আমরা আলোচনার টেবিলে বসে চুক্তি করতে প্রস্তুত।”
তবে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার দাবি করেছেন, পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব এখন কানাডার।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে ‘সেরা চুক্তির প্রস্তাব’ দিয়েছিল, কিন্তু কানাডা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগও খুব সীমিত রয়েছে বলে তিনি জানান।
কানাডার সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসিকে দেওয়া পৃথক এক সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার পাল্টা শুল্ক আরোপের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার কিছু পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।
বোম্বার্ডিয়ার নিয়েও ট্রাম্পের হুমকি
বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ার নিয়েও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কানাডাভিত্তিক বোম্বার্ডিয়ার যুক্তরাষ্ট্রে তাদের উৎপাদন সরিয়ে না নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির সব ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারেন তিনি।
বোম্বার্ডিয়ার কানাডার অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির এক প্রতিবেদনের মতে, ২০২৪ সালে কানাডার বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিষ্ঠানটি ৭ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি অবদান রেখেছে।
এর আগে সপ্তাহান্তে ট্রাম্প একাধিক ট্রুথ সোশ্যালে পোস্টে কানাডার সমালোচনা করেন। একটি পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বিনিময় হারকে তিনি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। আরেকটি পোস্টে উত্তর আমেরিকার মানচিত্রে কানাডা, মেক্সিকো ও গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা বসানো একটি ছবি প্রকাশ করেন।
প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোর একটি বিদ্যমান। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
নতুন মার্কিন শুল্ক এবং কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বর্তমানে কানাডার গাড়ি ও ট্রাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। একই সঙ্গে কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের ওপরও শুল্ক রয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে ট্রাম্প আরও কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এর মধ্যে রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহল, হকি স্টিক ও সুগন্ধির মতো পণ্য।
এর জবাবে কানাডা মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা শত শত পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি এসব শুল্ককে ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কোন পণ্যে কত শুল্ক?
নতুন শুল্ক কাঠামো অনুযায়ী—
মার্কিন দুধ, গলফ ক্লাব, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং জ্যাকেট ও টি-শার্টের মতো কিছু পোশাকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে;
চিজ, টয়লেট পেপার ও এয়ার কন্ডিশনারের মতো কিছু গৃহস্থালি পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক;
ফর্কলিফট ট্রাক ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ছাঁচে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা মার্কিন গাড়ি ও ট্রাকের ওপর কানাডার যে পাল্টা শুল্ক রয়েছে, সেটিও বহাল থাকছে।
ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, অধিকাংশ কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপের পক্ষে রয়েছেন। তবে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, নতুন শুল্কের কারণে পোশাক, খাদ্য ও আসবাবপত্রের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সও সরকারকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সুনির্দিষ্ট ও সীমিত’ পন্থা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির প্রধান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যান্ডেস লেইং বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারছে। তবে তারা ‘অন্তহীন উত্তেজনা বৃদ্ধির’ পরিস্থিতি চায় না। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা এই বাণিজ্য বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
লবস্টার শিল্পে পারস্পরিক নির্ভরতা
কানাডার মৎস্যশিল্পের চাপের মুখে সরকার পাল্টা শুল্কের তালিকা থেকে কয়েক ডজন সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য বাদ দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের লবস্টার শিল্পের মধ্যে গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ধরা অনেক লবস্টার প্রথমে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কানাডায় পাঠানো হয়। পরে সেগুলো আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিয়ে বাজারজাত করা হয়। ফলে একতরফা শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিতে মিশ্র সংকেত
সাম্প্রতিক বাণিজ্য উত্তেজনার আগে কানাডার অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিস্থাপকতার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছিল।
তবে আগস্টে প্রায় ৪১ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। বাণিজ্য আলোচনার ভেঙে পড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের সময়ের সঙ্গেই এই কর্মসংস্থান কমার ঘটনা মিলে গেছে।
এর মধ্যেও উৎপাদন খাতে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কানাডার সরকার বলছে, দেশীয় পণ্য কেনার প্রবণতা বাড়ায় ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা বৃদ্ধিই এর অন্যতম কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমাতে চান কার্নি
দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। কানাডার রফতানি বাজারকে আরও বৈচিত্র্যময় করার ওপর তিনি জোর দিচ্ছেন।
জুলাইয়ের পরিসংখ্যানেও এর কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেছে। কানাডার মোট রফতানির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রগামী পণ্যের অংশ কমে ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগে এই হার গড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল।
তবে দুই দেশের অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার গভীর আন্তঃনির্ভরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দ্রুত সরে গিয়ে বিকল্প বাজার তৈরি করা কানাডার জন্য সহজ হবে না। ফলে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ওয়াশিংটন ও অটোয়া শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথে ফিরবে, নাকি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বাণিজ্যযুদ্ধে পরিণত হবে। সূত্র:
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন