০১:২৩ পি.এম
দীর্ঘ ১১ বছর পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের অভিযোগের তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাকে উত্তরার বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর কিভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
তদন্তের অংশ হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে ভারতে করা ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলার নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই মামলার বিচার চলাকালে ভারতীয় আদালতে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষ্য ও বক্তব্যও পর্যালোচনা করছে প্রসিকিউশন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় মূল তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক আসামি ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছেন এবং আরও কয়েকজনের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২০১৫ সালে উত্তরার বাসা থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে, ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তৎকালীন বিএনপির মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমদকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ। ওই সময় তিনি নিখোঁজ ছিলেন। প্রায় দুই মাস পর, একই বছরের ১১ মে, ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশের হাতে উদ্ধার হন সালাহউদ্দিন। তখন ভারতীয় পুলিশ জানিয়েছিল, শিলংয়ে তাকে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
আরও পড়ুন: ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি: প্রতিমন্ত্রী টুকু
পাসপোর্ট বা বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকায় তার বিরুদ্ধে ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় মামলা করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিনকে বাংলাদেশ থেকে কী প্রক্রিয়ায় ভারতে নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলার অনুলিপি ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় আদালতে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহের কাজ চলছে।
ভারতীয় আদালতের নথিতে কী পাওয়া গেছে
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের আদালতে সালাহউদ্দিন আহমদের নিজের বক্তব্যের পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে দেওয়া বক্তব্য, তাকে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকের বক্তব্য এবং তাকে উদ্ধারের পর পুলিশের কাছে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য রয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে প্রসিকিউশনের দাবি, সালাহউদ্দিন আহমদ স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি। বরং বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে ভারতে ছেড়ে দিয়েছিল।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৬১ দিন তাকে টিএফআই সেলে আটক রাখা হয়েছিল, যেটি ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত। এরপর তাকে মেঘালয়ের শিলংয়ে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ট্রমাটাইজড অবস্থায় ঘোরাফেরা করছিলেন। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কারণে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি না থাকায় তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় মামলা করা হয়।
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগে আইনের ব্যত্যয় হয়নি: অ্যাটর্নি জেনারেল
আদালতের রায়েও উঠে আসে অপহরণের বিষয়
২০১৫ সালের ২২ জুলাই ভারতের নিম্ন আদালতে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলার বিচার শেষে ২০১৮ সালে তিনি খালাস পান। চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, ওই মামলায় ভারতীয় পুলিশের সাক্ষীরাও আদালতে স্বীকার করেছিলেন যে, সালাহউদ্দিনকে বাংলাদেশ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে ভারতে নিয়ে গিয়ে সেখানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
সালাহউদ্দিনের পক্ষে দেওয়া সাক্ষ্য এবং ভারতীয় পুলিশের সাক্ষ্য- দুই পক্ষের বক্তব্যেই তিনি স্বেচ্ছায় ভারতে প্রবেশ করেননি বলে প্রমাণিত হয় বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভারতীয় আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেন। নিম্ন আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ভারত সরকার আপিল করে। তবে আপিল আদালতও আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তার ভাষ্য, আপিল পর্যায়েও প্রমাণিত হয় যে সালাহউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে ভারতে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। তিনি নির্দোষ এবং অপহরণের শিকার-এই বিবেচনাতেই আপিলেও তাকে খালাস দেওয়া হয়।
খালাসের পরও দেশে ফিরতে সময় লাগে
আরও পড়ুন: রাশেদ খাঁন: হাজার ডিসেম্বর গেলেও হাসিনা ফিরবেন না
ভারতের আপিল আদালতে খালাস পাওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরতে পারেননি সালাহউদ্দিন। ২০২৩ সালের ৮ মে তিনি ভ্রমণ অনুমোদনের জন্য আসাম রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। অনুমোদন পেলে দেশে ফিরে দেশবাসী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে চান বলে তখন জানিয়েছিলেন তিনি। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের আপিল আদালতেও তিনি খালাস পান এবং তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরদিন, ৬ আগস্ট সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাস বা ভ্রমণ অনুমোদন পান। শেষ পর্যন্ত ওই বছরের ১১ আগস্ট তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে। দেশে ফেরার প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে গুমের অভিযোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অন্যান্য আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম। এ ছাড়া আরও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়। এ মামলায় জিয়াউল আহসানকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৩ জেলায় স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক পদে ১৩ উপসচিবের পদায়ন
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, দীর্ঘদিন গুম থাকার পর যারা পরবর্তীতে উদ্ধার হয়েছেন, তাদের ঘটনাগুলোও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদের ঘটনাটি তার মধ্যে অন্যতম।
তদন্তে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, সালাহউদ্দিন আহমদকে ভারতে নেওয়ার প্রক্রিয়া, শিলংয়ে তার অবস্থান, তাকে উদ্ধারের ঘটনা এবং ভারতে হওয়া মামলার তথ্য-প্রমাণ, সবকিছুই তদন্তের আওতায় এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রতিবেদন দাখিলের কাছাকাছি চলে এসেছে প্রসিকিউশন। আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় মূল তথ্য-প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে কয়েকজনের বিষয়ে তদন্ত এখনও চলছে। তদন্তের ভিত্তিতে তাদের গ্রেফতারের প্রক্রিয়া নেওয়া হবে এবং সময়মতো এ বিষয়ে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম.
আরও পড়ুন: শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন