০৪:৩৩ পি.এম
নরসিংদী, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ : নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, দ্রুত সেবা প্রদান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে।
বর্তমানে রায়পুরা উপজেলার সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি চিকিৎসাসেবার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহির্বিভাগে নিয়মিত এবং জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে প্রাথমিক ও সাধারণ চিকিৎসার জন্য রোগীদের জেলা সদর কিংবা রাজধানী ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে আধুনিক সেল কাউন্টার মেশিন সংযোজন করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে রোগীদের সময় ও ভোগান্তি কমেছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়ও হ্রাস পেয়েছে।
আরও পড়ুন: জিয়ানগরে ইউপি নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল জলিল শেখের সমর্থকদের নিয়ে জনসংযোগ ও পথসভা
এছাড়া, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ শয্যার পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেল কাউন্টার মেশিনের মাধ্যমে দ্রুত রোগ নির্ণয় করে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপস্থিতিও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে এক্স-রে সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সরকারি নির্ধারিত মূল্যে করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি সরবরাহ করা ওষুধও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় রোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও তদারকির ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাঙ্গন পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। রোগীদের জন্য অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যাচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ জোরদার করেছে। বিশেষ করে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন, ওপেন এসআরপি’র মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণ, ভারবাল অটোপসি এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রমে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: চলতি বছরে ৯ মাসে ‘মব’ সহিংসতায় নিহত ১৮৭ জন
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার জনগণের, বিশেষ করে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রায়পুরার নিলক্ষা এলাকার বাসিন্দা মাজেদা বেগম বাসসকে জানান, "আগে হাসপাতালে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। পরিবেশও তেমন ভালো ছিল না। এখন চিকিৎসকরা মনোযোগ দিয়ে রোগীদের কথা শুনছেন এবং পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন হয়েছে।"
জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন আহমেদ ইসলাম বলেন, "জরুরি প্রয়োজনে এখন আগের তুলনায় দ্রুত চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি কমেছে।"
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুন নাঈম বাসসকে বলেন, "দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।"
আরও পড়ুন: ফরিদগঞ্জে জালটাকা দিয়ে কেনাকাটার অভিযোগে ৪ নারী আটক
তিনি আরও বলেন, "চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং সরকারি ওষুধের স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইপিআই, হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন, কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা, ওপেন এসআরপি ও ভারবাল অটোপসির মতো কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।"
ডা. জান্নাতুন নাঈম আরও জানান, "সেল কাউন্টার মেশিনের মতো আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজনের ফলে রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতায়ও গতি বেড়েছে। চিকিৎসক, নার্স, মাঠকর্মী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এসব পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
তিনি উল্লেখ করেন, "প্রয়োজনীয় জনবল ও আরও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া গেলে রায়পুরার মানুষকে আরও উন্নত ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।"
নরসিংদীর সিভিল সার্জন ডা. মো. বুলবুল কবীর বাসসকে জানান, "সেবার মান আরও বাড়াতে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এ উপজেলাটি অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল রয়েছে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে সময় লাগে। এসব এলাকার মানুষের জন্য আরও একটি ১৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পশু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সহকারীর হাতে প্রসব, নবজাতকের মৃত্যু
তিনি বলেন, "প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি ‘জীবন তরী’ পাঠানোর জন্যও আবেদন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ বদ্ধপরিকর।"
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভর্তি রোগীদের জন্য শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন