প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অটোরিকশায় যুক্ত হচ্ছে কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম
সরকার একটি ডিজিটাল, নিবন্ধিত ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার আওতায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ না করে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই উদ্দেশ্যে প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম যুক্ত করা হবে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর উত্থাপিত একটি নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান।
সংসদ অধিবেশনে রেহানা আক্তার রানু রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি এআই নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরার সুফল এবং অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর সড়কে লাল বাতি অমান্য করা, লাইন পরিবর্তন কিংবা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর মতো অনিয়ম অনেকাংশেই কমে এসেছে।" তবে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন যে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গতিতে চলছে। এই যানগুলোর নম্বর প্লেট না থাকার কারণে এআই ক্যামেরায় অনিয়ম শনাক্ত হলেও জরিমানা করা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সংরক্ষিত নারী আসনের এই এমপি আরও বলেন, ঢাকা শহরে বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা প্রধান সড়কগুলোতেও ঢুকে পড়ছে। কাঠামোগত নকশার অভাবের কারণে প্রায়ই এসব বাহন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তবে কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
অতএব, অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে তাদের কাঠামোগত পরিবর্তন, নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও প্রশিক্ষণের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
নোটিশের বিপরীতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজি বাইক ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক যানগুলো গ্রামীণ ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার একটি প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কম খরচ ও সহজ যাতায়াতের কারণে যেমন সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে, তেমনি চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবা দাতাসহ একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও রাজস্ব ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, সারাদেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। ঢাকা শহরেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
এসময় পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এসব রিকশায় যে ক্ষতিকারক লেড-এসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় এবং এর অনিরাপদ রিসাইক্লিংয়ের কারণে যে ধোঁয়া ও সিসা নির্গত হয়, তা বাতাস, মাটি ও পানি মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।" তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশেই যুক্ত ছিল অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
বর্তমান আইনি পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে ডিএমপি নিয়মিত অভিযান ও ডাম্পিং পরিচালনা করছে। একইসঙ্গে ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। সড়ক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ঢাকা শহরের ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে, যা পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সম্পূরক প্রশ্নের সুযোগ পেয়ে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি রিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি, বরং একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "প্রতিদিন কেবল ঢাকাতেই অন্তত ৩০০টি নতুন অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে এবং প্রতিদিন ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এদের পেছনে খরচ হচ্ছে, যা বর্তমান লোডশেডিংয়ের একটি প্রধান কারণ।" তিনি বাহন জব্দ করা, ডাম্পিং কিংবা পুলিশের হয়রানি বন্ধ করে এগুলোকে ভেতরের গলির রাস্তায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা, বিআরটিএ নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক জোনিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেন। শেষ পর্যায়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, এই সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ঠিক কবে নাগাদ তৈরি ও বাস্তবায়িত করা হবে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সূত্রে সংসদকে নিশ্চিত করেন যে, সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ও নীতিমালা এরইমধ্যে প্রণীত হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক চূড়ান্ত হওয়া এই নীতিমালায় রূপরেখা নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে কোনো চালকের কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়।
মন্ত্রী জানান, নীতিমালার অধীনে একটি ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্যে কিউআর কোড এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু থাকবে, যাতে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক রিকশা চালানোর সুযোগ না থাকে। একইসঙ্গে লেড-এসিড ব্যাটারি তুলে দিয়ে ডিজিটাল পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারে কঠোর শর্ত দেওয়া হবে।
সবশেষে বিদ্যুৎ ও সিটি কর্পোরেশনের অসাধু কর্মচারীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঈমানদারিতার সঙ্গে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অতি দ্রুত এই নীতিমালার পূর্ণ প্রয়োগ ঘটাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন