প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভূমধ্যসাগরের তলদেশে একটি বাণিজ্যতরির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা বিশ্বের প্রাচীনতম জাহাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের আন্তালিয়া প্রদেশের কেকোভা দ্বীপের নিকটে এই ধ্বংসাবশেষের বয়স আনুমানিক ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছর। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি প্রাথমিক ব্রোঞ্জ যুগের নিদর্শন, যখন মিসরের বিখ্যাত গিজার মহাপিরামিড নির্মাণ করা হচ্ছিল। বিবিসি রিপোর্ট করেছে।
জাহাজটির কাঠের কাঠামো এত দীর্ঘ সময় পানির নিচে বিলীন হয়ে গেছে। তবে এর বহন করা মাটির পাত্র ও পাথরের নোঙর সমুদ্রতলে রয়ে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, প্রায় ১০ মিটার দীর্ঘ জাহাজটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো।
কেকোভা দ্বীপের উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ মিটার গভীরে ঢালু সমুদ্রতলে জাহাজটির নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। সেখানে তিনটি বড় পাথরের নোঙর এবং ৩০টির বেশি মাটির তৈরি পণ্য সংরক্ষণের পাত্র পাওয়া গেছে। এসব পাত্রকে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় ‘অ্যামফোরা’ বলা হয়।
নকশায় মিলেছে জাহাজের বয়স
জাহাজটির কাঠের অংশ অবশিষ্ট না থাকায় রেডিওকার্বন পদ্ধতিতে এর বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তাই প্রত্নতাত্ত্বিকেরা পাত্রগুলোর আকৃতি, নকশা ও অলংকরণ বিশ্লেষণ করে সময়কাল নির্ধারণ করেন।
তুরস্কের আকদেনিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হাকান ওনিজের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের গবেষকেরা দেখতে পান, পাত্রগুলোর দুই পাশে হাতল, মাঝখানে উঁচু খাঁজ এবং সমতল তলদেশ রয়েছে। মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া একই ধরনের প্রাচীন পাত্রের সঙ্গে এগুলোর মিল রয়েছে। এসব তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গবেষকেরা জাহাজটিকে প্রাথমিক ব্রোঞ্জ যুগের বলে চিহ্নিত করেছেন।
ওনিজের ভাষ্য অনুযায়ী, পাত্রগুলোর অলংকরণ কৌশল বিশ্লেষণ করে জাহাজটির সময়কাল সম্পর্কে তারা অত্যন্ত নিশ্চিত হয়েছেন।
কোথায় যাচ্ছিল জাহাজটি?
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, জাহাজটি ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের কোনো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের উপকূলীয় অঞ্চল এর সম্ভাব্য যাত্রাপথের মধ্যে পড়ে।
গবেষকেরা মনে করছেন, জাহাজটি বর্তমান তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন ট্রয় নগরী কিংবা গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের মিনোয়ান সভ্যতার কোনো গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল।
মিসরের গিজা, সাক্কারা ও আবুসিরের পাশাপাশি ট্রয় ও ক্রিটে একই ধরনের পাত্র পাওয়ার ঘটনা প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক যোগাযোগের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ চালু ছিল।
জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা পাত্রগুলোর কিছুতে এখনো ঘন, চকচকে পদার্থের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিক ড. কারিন সোভাডা পাত্রগুলো পরীক্ষা করে এ আবিষ্কারে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, পাত্রের ভেতরে অবশিষ্ট পদার্থের পরিমাণ দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। এত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার পরও কিছু পাত্রে দৃশ্যমান অবশিষ্টাংশ টিকে থাকা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
গবেষকেরা এখন পরীক্ষা করে দেখছেন, এসব পাত্রে কী বহন করা হয়েছিল। এগুলোতে জলপাই তেল, ওয়াইন কিংবা গাছের রজন রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে পাত্রগুলো একাধিকবার ব্যবহৃত হয়ে থাকলে ভেতরের অবশিষ্টাংশ আগের কোনো পণ্যেরও হতে পারে।
প্রায় পাঁচ হাজার বছর পর মানুষের স্পর্শ
কেকোভা দ্বীপের আশপাশের সমুদ্রপথ প্রাচীনকাল থেকেই বিপজ্জনক হিসেবে পরিচিত। প্রবল বাতাস ও স্রোতের কারণে এ অঞ্চলে বহু জাহাজ ডুবে গেছে। বর্তমানে এলাকাটিতে শত শত জাহাজের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
সমুদ্রের গভীরে কাজ করার সময় ডুবুরিদেরও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়। পানির নিচে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার করতে সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালানো হচ্ছে।
অধ্যাপক ওনিজ বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার বছর পর তাঁরা প্রথমবারের মতো এসব বস্তু স্পর্শ করছেন। তাঁর কাছে এ আবিষ্কার শুধু একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ নয়; বরং সেই জাহাজের সঙ্গে যুক্ত নাবিক, পাত্র নির্মাতা, পণ্য বহনকারী শ্রমিক এবং তাঁদের অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যদের জীবনকাহিনিও।
এই আবিষ্কারের ফলে বিশ্বের প্রাচীনতম জাহাজডুবির রেকর্ড নতুন করে নির্ধারিত হতে পারে। এর আগে গ্রিসের দোকোস দ্বীপের কাছে পাওয়া প্রায় ৪ হাজার ২০০ বছরের পুরোনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষকে সবচেয়ে প্রাচীন বলে বিবেচনা করা হতো। অন্যদিকে, কাঠের অংশ সংরক্ষিত থাকা প্রাচীনতম জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে কৃষ্ণসাগরে বুলগেরিয়ার উপকূলে, যার বয়স প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছর।
কেকোভার এই আবিষ্কার প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার সুযোগ তৈরি করেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন