প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত মাসে পাকিস্তান তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে ‘চায়না এয়ারলাইন্স’ এবং ‘ইভা এয়ার’কে বাধা দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা ইসলামাবাদের ‘এক চীন নীতি’তে বেইজিংয়ের প্রভাবের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ মন্তব্য করেছেন, ‘চীনের এক চীন নীতি অনুসরণ করে পাকিস্তানের আকাশসীমায় কেবল মূল ভূখণ্ডের চীনা বিমান সংস্থাগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।’ এই পদক্ষেপটি অস্বাভাবিক ছিল, কারণ চীনও তাইওয়ানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলোর ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপ করে না।
যদিও এই নিষেধাজ্ঞাটি আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং উভয় বিমান সংস্থাকে ২০২৭ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। এই সময়সীমার পরে কী হবে, সে সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তান ও তাইওয়ানের মধ্যে সম্পর্ক খুবই সীমিত। ইসলামাবাদ কঠোরভাবে ‘এক চীন নীতি’ মেনে চলে এবং চীনের সঙ্গে ‘অটল বন্ধুত্ব’ বজায় রাখে। তাইওয়ানে ৯০০ জনেরও বেশি পাকিস্তানি নাগরিক বসবাস করেন, যাদের মধ্যে ছাত্র, রেস্তোরাঁর মালিক এবং অন্যান্য পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত। দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সরাসরি ফ্লাইট নেই এবং আগেও ছিল না। দক্ষিণ এশিয়া এবং তাইওয়ানের মধ্যে একমাত্র বিমান সংযোগ হলো তাইপে-দিল্লি রুট, যা ১ ডিসেম্বর থেকে পুনরায় চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
পাকিস্তানের এই নিষেধাজ্ঞাটি ছিল ‘এক চীন নীতি’র প্রতি ইসলামাবাদের স্বাভাবিক আনুগত্যের চেয়েও কঠোর। ইসলামাবাদ এই নীতির অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক, যা নিয়মিতভাবে পুনর্ব্যক্ত করে। চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে নিঃশর্ত সমর্থন করে। পাকিস্তানের কঠোর আনুগত্যের অর্থ হলো- তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা, তাইওয়ান চীনের অংশ বলে বেইজিংয়ের দাবি মেনে নেওয়া এবং তাইপের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় না রাখা। তবে নীতিটিকে ভিন্নভাবে দেখা হয়। চীনের এই নীতি যেসব দেশ মেনে চলে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও তাইওয়ানে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং অনানুষ্ঠানিক কার্যালয় বজায় রাখে।
এর আগেও বিভিন্ন দেশ রাজনৈতিক কারণে তাইওয়ানের বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে'র আফ্রিকার একমাত্র কূটনৈতিক মিত্র এসওয়াতিনিতে পরিকল্পিত সফরটি সাময়িকভাবে বাতিল হয়ে যায়। যদিও প্রেসিডেন্টের ফ্লাইটে বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলোকে আকাশসীমা ব্যবহারের অধিকার অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
তাহলে, পাকিস্তানে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী হতে পারে? এটি কি চীনের 'ধূসর অঞ্চলের' কার্যকলাপের সম্প্রসারণ ছিল? অথবা চীন-পাকিস্তানের সর্বকালীন বন্ধুত্ব থেকে উদ্ভূত আনুগত্যের প্রকাশ?
পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো, চীন ‘এক চীন নীতি’কে শক্তিশালী করতে, তাইওয়ানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাকে নিরুৎসাহিত করতে এবং তার সহযোগীদের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব প্রদর্শন করতে পাকিস্তানকে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বলেছে। তাইওয়ান বিষয়ে চীনের অবস্থানের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সমর্থক হিসেবেই পাকিস্তান রয়েছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, পাকিস্তান চীনের প্রতি তার আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য নিজ উদ্যোগে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে- যখন দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। মক্কা চুক্তি হয়তো বেইজিংকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের প্রেরণা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্যতম প্রধান অংশ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরটি একটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বেইজিংয়ের জন্য এটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে নয়। এই প্রেক্ষাপটে, এই নিষেধাজ্ঞাটি হয়তো একটি প্রতীকী পদক্ষেপ ছিল, যা দেখিয়ে দেয় যে, ওয়াশিংটনের কাছাকাছি আসার জন্য পাকিস্তানের প্রচেষ্টা চীনের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিনিময়ে হয়নি। যদিও এরপর আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, অন্তত আপাতত- বেইজিংয়ের কাছে বার্তাটি ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে যাতায়াতকারী তাইওয়ানের ফ্লাইটগুলোর জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা সুবিধাজনক। ২০২৭ সালের মার্চের সময়সীমার পর যদি পুনরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তবে তাইওয়ানের জন্য এর দীর্ঘমেয়াদী বড় কোনো প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে ফ্লাইট পথ পরিবর্তন হলে এই রুটগুলোতে পরিচালনার সময়কাল ও খরচ বেড়ে যাবে। এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে, পাকিস্তান চীনের কাছে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে চায় এবং তাইওয়ানকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই সুবিধা প্রদর্শন করতেও ইচ্ছুক।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি কোনো নজির স্থাপন করে কি না। চীন একই ধরনের চাপ ব্যবহার করে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ এবং ‘এক চীন নীতি’ কঠোরভাবে মেনে চলা অন্যান্য দেশগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে, যা তাইওয়ানের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য সমস্যা তৈরি করবে- বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থায় (আইসিএও) তাইপের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায়। বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করাও তাইওয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগের আরেকটি সম্ভাব্য উপায় হয়ে উঠতে পারে।
এই সিদ্ধান্তটি পাকিস্তানের ওপর চীনের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব এবং বেইজিংয়ের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে ইসলামাবাদের আরো এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার একটি প্রমাণ। কিন্তু এটি পাকিস্তানের জন্য তেমন কোনো উপকারে আসে না। বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ওপর ‘এক চীন নীতি’ প্রয়োগ করা হলে তা এমন একটি বিধিনিষেধ- যার রাজনৈতিক সংকেত দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো সুফল নেই। আরো সমস্যাজনক হলো, পাকিস্তান এই নীতির নিজস্ব ব্যাখ্যাকে এমন সব ক্ষেত্রে প্রসারিত করতে প্রস্তুত, যা ঐতিহ্যগতভাবে এর সঙ্গে যুক্ত নয়।
তথ্যসূত্র : লোয়ি ইনস্টিটিউট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন