০৫:১৮ পি.এম
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংঘর্ষের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটগুদামে দুর্বৃত্তদের দ্বারা আগুন লাগানো হয়েছে।
এছাড়া পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক ও বিভিন্ন কারখানার গেটে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মৌচাক কাটার এলাকায় পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়েছে, কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ লাঠিপেটার পাশাপাশি জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। মহাসড়ক অবরোধ থাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ ছিল। এতে চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ার পর কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। প্রথমে কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর ও চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় অবরোধ শুরু হলেও পরে রতনপুর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে এসব এলাকার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে হাজার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দ্বন্দ্ব, সংবাদ সম্মেলন
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে, চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটগুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে আগুন লাগার খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু শ্রমিক বিক্ষোভ ও মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দীর্ঘ যানজটের মধ্যে পড়ে ইউনিট দুটি প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। পরে বিজিবির পাহারায় মহাসড়কের উল্টো পথে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দুটি ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার তারেকুল ইসলাম জানান, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটগুদামে আগুন লাগার খবর পেয়ে দুটি ইউনিট পাঠানো হয়েছে। সড়কে যান চলাচল বন্ধ ও যানজটের কারণে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরে বিজিবির সহায়তায় উল্টো পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে আগুন কীভাবে লেগেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন, মৌচাক কাটার এলাকায় পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক ও বিভিন্ন পোশাক কারখানার গেটে ভাঙচুর চালানোর খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং হতাহতের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হোসেন জানান, শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। তারা কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা একটি পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: জাতীয় যুব দিবসে শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মীর সম্মাননা পেলেন জান্নাতুল নাঈমা!
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন পিপিএম-সেবা জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে মহাসড়ক অবরোধ থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ নুরুল করিম ভূঁইয়া জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এক সপ্তাহ দায়িত্ব পালন করবে। বর্তমানে মহাসড়কে অবরোধ থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।
শ্রমিক আন্দোলনের কারণে শুধু যানবাহন চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে না, জরুরি সেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কে অবরোধ ও যানজটে আটকে পড়া একটি অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে চালককে বিপাকে পড়তে হয়েছে বলে জানা গেছে। চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কে যানবাহন আটকে থাকায় সাধারণ যাত্রী, রোগী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। এরই মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ সিদ্ধান্তের পরও শ্রমিকদের আন্দোলন থামেনি।
আরও পড়ুন: মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উত্তোলনে জিটিসির নতুন রেকর্ড
শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করার দাবিতে তারা আন্দোলন করছে।
এর আগে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটক এলাকায় শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। ওই দিন শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। অবরোধের কারণে অন্তত ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল বলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। রাতে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দিলেও রোববার সকালে আবারও অবরোধ শুরু করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন