প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি বৃদ্ধ দম্পতির ৬৫ বছরের দীর্ঘ সংসার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করছেন এবং দূরদেশে কাজের সন্ধানে যাওয়া তাদের ছেলের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। চারপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলো ক্রমশ জনশূন্য হয়ে পড়ছে, প্রতিবেশীরা একে একে তাদের ভিটেমাটি ত্যাগ করছেন। এই নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা এবং অপেক্ষার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ভারতীয় সিনেমা ‘পাইরে’। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ছবিটি মুক্তির জন্য পরিবেশক পাওয়া যায়নি। অবশেষে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসায় ভাসছে সিনেমাটি। উল্লেখযোগ্যভাবে, এরই মধ্যে ছবিটি ১৮টি পুরস্কারও অর্জন করেছে।
১১১ মিনিটের এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন বিনোদ কাপরি, যিনি টেলিভিশন সাংবাদিক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। ছবিটি উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নির্মিত, যেখানে উঠে এসেছে এক বৃদ্ধ দম্পতির জীবনের শেষ অধ্যায়ের গল্প। পাশাপাশি, কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতা, জনশূন্য হয়ে পড়া পাহাড়ি জনপদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে।
ছবির কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র পদম সিং ও তুলসি। স্থানীয় ভাষায় তাদের ডাকা হয় ‘বুবু’ ও ‘আমা’। পদম সিং চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরিচালকের চাচা পদম সিং এবং তুলসি হয়েছেন হীরা দেবী। বাস্তব জীবনে তারা সাধারণ গ্রামবাসী এবং এর আগে কখনো ক্যামেরার সামনে অভিনয় করেননি।
পাহাড়ের একটি ছোট্ট বাড়িতে বসবাস করেন এই দম্পতি। তাদের ছেলে হারিয়া ২৮ বছর আগে কাজের সন্ধানে মুম্বাইয়ে চলে গেছেন। এরপর থেকেই বাবা-মায়ের দিন কাটছে তার ফেরার অপেক্ষায়। পরিচালক বিনোদ কাপরির ভাষায়, ‘তারা ৬৫ বছর ধরে একসঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন এবং গত ২৮ বছর ধরে তাদের ছেলে হারিয়ার ফেরার অপেক্ষা করছেন। কাজের সন্ধানে সে মুম্বাইয়ে গেছে। এটি সঙ্গ, নিঃসঙ্গতা আর অপেক্ষার গল্প।’
ছবিতে তাদের চারপাশের গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ার বাস্তবতাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেশীরা একে একে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছাড়ছেন। একপর্যায়ে, সাহায্য করার মতো কেউ না থাকায় পদম সিং নিজের বাড়ির সামনে দুটি চিতা তৈরি করেন—একটি স্ত্রীর জন্য এবং অন্যটি নিজের জন্য। তুলসি কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তুমি মারা গেলে আমি তোমাকে পাহাড় থেকে নিচে নামাব কীভাবে?’
বিষণ্নতার গল্প হলেও ‘পাইরে’তে হাস্যরস ও দাম্পত্যের মিষ্টি খুনসুটিও রয়েছে। ২০১৮ সালে উত্তরাখণ্ডের মুন্সিয়ারিতে এক বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ছবিটির ভাবনা আসে পরিচালকের মাথায়। তাদের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কথা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। বৃদ্ধ স্বামী বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো, আমি যদি আগে মারা যাই, তাহলে ওর দেখাশোনা কে করবে?’ আর তার স্ত্রী বলেছিলেন, ‘সে তো রান্না করতেও জানে না। তাই আমি যদি আগে মারা যাই, তাহলে ওর জন্য কে রান্না করবে, তা নিয়ে আমার চিন্তা হয়।’
প্রথমে ওই বাস্তব দম্পতিকে নিয়েই সিনেমাটি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন কাপরি। পরে নাসিরুদ্দিন শাহ ও রত্না পাঠককে প্রধান চরিত্রে নেওয়ার কথা ভাবেন। চিত্রনাট্য পছন্দ হলেও তারা মনে করেছিলেন, ওই অঞ্চলের মানুষের চরিত্রে অভিনয় করা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত নিজের চাচা পদম সিং ও গ্রামের হীরা দেবীকে নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেন পরিচালক।
২০২৪ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ‘পাইরে’। পরিচালকের দাবি, সেরা চলচ্চিত্রের তিনটি পুরস্কারসহ মোট ১৮টি সম্মাননা পেয়েছে ছবিটি। এর মধ্যে দর্শক ভোটে সেরা চলচ্চিত্র হওয়ার ১২টি পুরস্কার রয়েছে।
উৎসবে প্রশংসা পেলেও দুই বছর ধরে পরিবেশক না পাওয়ায় ছবিটির মুক্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অবশেষে পরিচালকের এক প্রযোজক বন্ধু এগিয়ে আসেন। গত ৩০ অক্টোবর মাত্র ৭০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। দর্শকদের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়তে থাকে টিকিটের চাহিদা ও প্রদর্শনীর সংখ্যা।
ছবিটি মুক্তির পর দর্শকের ভালোবাসায় আপ্লুত পদম সিং ও হীরা দেবী। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন আবেগাপ্লুত দর্শকেরা। অনেকে জানিয়েছেন, ছবিটি তাদের নিজেদের মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। হীরা দেবীর কথায়, ‘বাস্তবে আমাদের গ্রামটিও ঠিক এমনই।’
পদম সিংয়ের কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল নাসিরুদ্দিন শাহের সঙ্গে দেখা হওয়া। তিনি বলেন, ‘তিনি পুরো সিনেমাটি দেখেছেন এবং তার চোখে পানি ছিল। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বুবু, তুমি যে চরিত্রে অভিনয় করেছ, সাত জন্মেও আমি তা করতে পারব না।’
ছবিটির গল্পের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশেও বার্তা দিয়েছেন পদম সিং। তার কথায়, ‘আমি তাদের বলতে চাই, নিজেদের মাতৃভূমি, যে মাটিতে তাদের জন্ম, তা যেন তাঁরা পরিত্যাগ না করেন।’ পাশাপাশি মানুষের বসবাসের এলাকাতেই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন