প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সাগরে মাছ ধরার ৫৮ দিনের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। আগামী ১১ জুন থেকে জেলেরা আবারও সাগরে নামছেন। এই উপলক্ষে কক্সবাজার উপকূলে ট্রলার প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা চলছে। দীর্ঘ বিরতির পর মাছ ধরার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত জেলেরা। তবুও বর্ষা মৌসুমের উত্তাল সাগর এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের মনে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
মৎস্য বিভাগের আশা, সফল নিষেধাজ্ঞার ফলে এবার সাগরে ধরা পড়বে বিপুল পরিমাণ মাছ। লাভবান হবেন জেলে ও ট্রলার মালিকেরা।
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যান ঘাটে নদীতে নোঙর করা ট্রলারগুলোতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এফবি মা-মেহেরুন্নেছা ট্রলারের ২২ জেলে প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছেন। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ ড্রামে পানি ভরছেন, আবার কেউ ট্রলারের পাটাতন ও ইঞ্জিন ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন। দীর্ঘ ৫৮ দিনের অপেক্ষার পরে সাগরে নামার সুযোগ পেয়ে সকলের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস এবং প্রত্যাশার ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।
এফবি মা-মেহেরুন্নেছা ট্রলারের জেলে সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘দীর্ঘ ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আমরা সাগরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ট্রলার এবং জালসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আমরা খুবই খুশি। আশা করছি, সাগরে মাছ ধরতে গেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারব।’
একই ট্রলারের মাঝি লুৎফুর রহমান বলছেন, ‘সাগরে গেলে অবশ্যই ভালো লাগবে। কারণ মাছ ধরা আমাদের একমাত্র জীবিকা। কাজ করতে না পারলে পরিবার নিয়ে চলা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের ট্রলারের ২২ জন জেলে সকলেই ট্রলারে এসেছে। জাল, রশি, তেল, চাল-ডাল থেকে শুরু করে বাঁশ ও ড্রাম সবকিছু ট্রলারে নিয়ে আসা হয়েছে। এখন ইঞ্জিন এবং রঙের সামান্য কাজ বাকি আছে, যা বুধবারের মধ্যে শেষ হবে। আশা করি, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরে সাগরে গিয়ে জালে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ধরা পড়বে।’
৬ নম্বর ঘাটে নোঙর করা একটি ট্রলারের মাঝি আয়ুব আলী বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আমরা খুবই খুশি। দীর্ঘদিন সাগরে যেতে না পেরে পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। আয়-রোজগার বন্ধ থাকার কারণে সংসার চালানো একেবারেই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, জাল এবং ট্রলার মেরামতের কাজ শেষ করছি। আশা করছি, সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে পারলে আবার স্বাভাবিকভাবে পরিবার চালাতে পারব।’
শুধু বাঁকখালী নদী নয়, কক্সবাজার উপকূলজুড়ে একই চিত্র বিরাজমান রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত লাখো জেলে। তবে এই আনন্দের মাঝেও শঙ্কা রয়েছে। কারণ নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে, যখন উত্তাল সাগর এবং বৈরী আবহাওয়া জেলেদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই মাছের আশায় বুক বাঁধলেও নিরাপদে ফিরে আসার চিন্তা তাদের মনে ভীড় করছে।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। জুন-জুলাই মাসে সাগরে আবহাওয়া সাধারণত খুবই বৈরী থাকে এবং বর্ষা মৌসুম শুরু হয়। আমাদের মতে, নিষেধাজ্ঞাটি যদি আরও কিছুটা পরে কার্যকর করা হতো, তাহলে ভালো হতো। এখন সাগরে যাওয়ার সময়ও আবহাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকবে।’
আরেক ট্রলারের মাঝি শুক্কুর আলী বলেন, ‘সরকার যখন নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন সাধারণত সাগরের আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর জুন-জুলাই মাসে ঝড়, বৃষ্টি এবং বৈরী আবহাওয়া শুরু হয়। এ সময় সাগর স্বাভাবিকভাবেই উত্তাল থাকে। ফলে মাছ ধরতে গিয়েও আমাদের নানা ঝুঁকি এবং কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। জীবিকা নির্বাহ করাও কঠিন হয়ে যায়।’
এদিকে, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও ট্রলার মালিকেরা স্বস্তিতে নেই। জ্বালানি, বরফসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে ব্যয় বাড়ছে কয়েকগুণ। তারপরও ভালো মাছের আশায় সামনে ১১ জুন থেকে সাগরে ট্রলার নামানোর জন্য তারা অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে মৎস্য খাতটি টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তা এবং বিশেষ নজরদারির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আগামী ১১ জুন নিষেধাজ্ঞার সমাপ্তি হওয়ায় জেলে এবং ট্রলার মালিকরা সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বরফ এবং অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় মৎস্য খাত বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছে। অনেক মালিকের জন্য ট্রলার সাগরে পাঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও জেলেরা মাছ পাওয়ার আশায় সাগরে যাচ্ছেন। সরকারের দ্রুত জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই খাতের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার জেলে, শ্রমিক এবং ব্যবসায়ী আরও বড় সংকটে পড়বেন।’
জেলা মৎস্য বিভাগের দাবি, সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলেদের আপত্তির বিষয়গুলোও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সুফল আগামী দিনগুলোতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি। জেলেদের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ে যে আপত্তি রয়েছে, বিশেষ করে মাছ ধরার মৌসুম এবং বৈরী আবহাওয়ার বিষয়গুলো, সেগুলো মৎস্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। আগামী ১১ জুন নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে। এ সময় জেলেরা যে সংযম ও সহযোগিতা করেছেন, তাতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের প্রজনন ও উৎপাদন ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী।’
কক্সবাজারে নিবন্ধিত প্রায় ৬৫ হাজার জেলে থাকলেও এ পেশায় জড়িতদের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেছে জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতি। এবং নৌযানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ হাজারের কাছাকাছি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন