প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
লক্ষ্মীপুরে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত এক মাসের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ ঘুস দাবির অভিযোগে অভিযুক্ত, আবার কেউ প্রকল্পে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন। কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, কিছুকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে এবং কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। একের পর এক কর্মকর্তার বিদায়ে জেলার উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকি ও বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জেলায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পৌরসভা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) কর্মকর্তাদের ঘিরে এসব ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা অভিযোগ করেছেন যে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ নিরীক্ষার প্রয়োজন।
বরখাস্ত পিডিবির প্রকৌশলী
লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর, যেখানে তার ঘুস দাবির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি বকেয়া বিল ও মালামালসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদনের বিনিময়ে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুস দাবি করেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে ‘২ কোটি টাকার নিচে নেব না’ বলতে শোনা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে পিডিবি। ঘটনার তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী
লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণের কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুলফিকার হোসেনকে তলব করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরপর তাকে জরুরি ভিত্তিতে খাগড়াছড়িতে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর
জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তারের বিরুদ্ধে বিনামূল্যে ৯ হাজার ৩৮৯টি টুইন-পিট ল্যাট্রিন বিতরণ এবং ৫৬ কোটি টাকার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধিবিষয়ক (ওয়াশ) প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮-৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণেও অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগের কারণে তাকেও লক্ষ্মীপুর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাঁধ প্রকল্পে দুর্নীতি
মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে কমলনগর ও রামগতি উপজেলাকে রক্ষায় তীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজের গতি ও মান নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিল। কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খানকে বদলি করা হয়েছে।
নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিস হায়দার খান দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে দপ্তরটিতে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে মো. নুরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর
সর্বশেষ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী শ্রাবনী চক্রবর্ত্তীর বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজে সরকারি দরপত্রের নিয়ম উপেক্ষা করে সিলড কোটেশনের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ নিয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। পরে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বদলি করা হয়েছে।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
জেলার উন্নয়নকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা পাঁচ নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পর একের পর এক তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুরের সভাপতি মো. কামাল হোসেনসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা মনে করেন, শুধুমাত্র বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনকালে সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি প্রকল্পের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রয়োজন। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাদের মতে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান, দরপত্রপ্রক্রিয়া ও বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা জরুরি। তা না হলে কর্মকর্তাদের বদলি হলেও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের ঝুঁকি থেকে যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন