প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রামে টানা পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টির ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বেশিরভাগ উপজেলা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করে উদ্ধার ত্রাণ বিতরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘দুর্যোগের এই সময়ে মানুষের জীবন রক্ষাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ তিনি অকপটে জানিয়ে দেন, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জীবন। কোনো প্রাণ যেন সামান্য অসচতনতার কারণেও ঝরে না পড়ে। সবাইকে অনুরোধ করব, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসুন।’
তিনি আরো জানান, পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করা হচ্ছে, এবং সেখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
ত্রাণ কার্যক্রমের প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। প্রথম দফার বরাদ্দ ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে এবং নতুন বরাদ্দও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত বিতরণ করা হবে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ খাদ্যসংকটে না পড়েন।’
উদ্ধার কার্যক্রমকে দ্রুততর করার জন্য জেলা প্রশাসক সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোটের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করা হয়েছে। স্পিডবোট পাওয়া গেলে পানিবন্দি মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো এবং উদ্ধারকাজ আরো কার্যকর হবে, আপাতত নৌকার মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান চলছে।’
তিনি উল্লেখ করেন, জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, রেড ক্রিসেন্ট, ইফসা, আনসার বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে নিয়ে পৃথক বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। এসব দল যেকোনো দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জেলা প্রশাসক পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে নিজের উপস্থিতি বজায় রাখার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘লালখান বাজার, পোড়া পাহাড় ও ১ নম্বর ঝিল সহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। সেসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।’
বর্তমানে জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড়, শিশুদের জন্য মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওরস্যালাইন এবং পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে প্রায় আট হাজার মানুষ ইতিমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো মানুষ অভুক্ত না থাকেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।
দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তুলে ধরে জেলা প্রশাসক স্পষ্ট করেন, ‘প্রতিটি উপজেলায় পৃথক কন্ট্রোল রুম এবং জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবেলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। তিনি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’
শেষে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা এবং প্লাবিত জনপদের বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। কারণ, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন