প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে অর্পিত সম্পত্তি অধিগ্রহণের প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের হেনস্তা ও অপেশাদার আচরণের কারণে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি বা এসিল্যান্ড) বদলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত এসিল্যান্ড মো. জসিম উদ্দিনকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি করেছে প্রশাসন।
আজ বুধবার (২৪ জুন) সিনিয়র সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার দাশ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে বদলি করা হয়। এর আগে, অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে ভূমি অফিসের পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তিনি চড়াও হয়েছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাটে অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানা দেখিয়ে সরকারের প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসিল্যান্ডের কার্যালয়ে যান সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মণ্ডল পলাশ। সাংবাদিকদের দেখামাত্রই মোবাইল ফোন জমা রাখার নির্দেশ এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন দেন। এরপর তথ্য বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি চেয়ার থেকে উঠে আঙুল তুলে ধমকাতে থাকেন। একপর্যায়ে তেড়ে এসে বলেন, ‘এটা কি ফাজলামোর জায়গা’ এবং বুম ও ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। ক্যামেরায় হাত দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি ফের ধমক দিয়ে বললেন, ‘এটা কি রেকর্ডের জায়গা? যান চলে যান।’ এ কথা বলার পর তিনি গাড়িতে উঠে অফিস ত্যাগ করেন।
এ নিয়ে গত শুক্রবার (১৯ জুন) সময় সংবাদে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনে হাসানপাড়া মৌজার অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানা হিসেবে উপস্থাপন করে প্রায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ নেয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সংবাদটি প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অর্পিত সম্পত্তি অধিগ্রহণের দুর্নীতি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
এ বিষয়টি রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের নজরে এলে তিনি তদন্তের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুল ইসলাম গত রোববার (২১ জুন) দুপুরে গাইবান্ধা সার্কিট হাউজে সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং যমুনা টিভির প্রতিবেদক পলাশসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য শোনেন এবং তা রেকর্ড করেন। তবে এ তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
মজার বিষয় হলো, গত রোববার (২১ জুন) তদন্তের ঠিক পরদিন হাসানপাড়া মৌজায় অর্পিত সম্পত্তি চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের জন্য হাসানপাড়া মৌজায় ১/১ ও ২৩৭ বিআরএস খতিয়ানের সাবেক ৭৬ ও ১১২ হাল দাগে সাড়ে ছয় শতক জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জমি ও স্থাপনা বাবদ ২ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩২ টাকা ৭০ পয়সা জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা থেকে ছাড় করা হয়। এই টাকা তুলে নেন পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর এবং তার পরিবারের সদস্যরা।
অথচ অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণকৃত ওই জমিটি মূলত অর্পিত সম্পত্তি। এই জমির মালিকানা দাবি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন একই ইউনিয়নের আসাদুল্লাহ ফারুকী। তার দাবি প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রতিপক্ষ জাহাঙ্গীর ও তার পরিবার ক্ষতিপূরণের কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। ফারুকী প্রশ্ন তোলেন, ‘সম্পত্তিটি অর্পিত হলে কীভাবে এই টাকা পরিশোধ করা হলো?’
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাদুল্লাপুরের এসিল্যান্ড এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছিলেন যে, ওই সম্পত্তিতে সরকারের কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। অথচ ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ধাপেরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পত্তিটিতে সরকারি স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
ভূমি অফিসের কোন প্রতিবেদনটি সঠিক, তা জানতে এর আগে গত ২ জুন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল সময় সংবাদ। সেদিনও তিনি অশোভন আচরণ করেছিলেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাকে ফোনে জানানো হলে তিনি খাস জমি সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ও সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বক্তব্য নেয়ার পরামর্শ দেন। সেদিন ইউএনও মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এমনকি ভূমি অফিসের দুই ধরনের প্রতিবেদনের বিষয়েও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। উল্টো ‘কেন কথা বলা যাবে না’ প্রশ্ন করলে তিনি এসিল্যান্ডের মতো আচরণের পুনরাবৃত্তির হুমকি দিযে প্রতিবেদককে চলে যেতে বলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন