প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বর্ষার সময় এলেই নেত্রকোনা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে বজ্রপাতের আতঙ্ক নেমে আসে। ভয়ে দিন পার করে এই অঞ্চলটির প্রান্তিক জনপদের মানুষ।
গত ৭ মাসে এই অঞ্চলটিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন।
এছাড়া গত সাড়ে পাঁচ বছরে বজ্রপাতের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। জেলা পর্যায়ের তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে বজ্রপাতে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ১২ জন এবং চলতি ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
বজ্রাঘাতে নিহতদের বেশির ভাগই কৃষক, জেলে এবং নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাদের বাধ্য হয়ে বজ্রপাত আতঙ্ক মাথায় নিয়েই নামতে হয় খোলা মাঠ, বিল ও হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। ফলে বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার তারাই হয়ে যান। জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরের বৃষ্টিতে বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪)। পরিবারের জন্য মাছ নিয়ে ফিরবেন এমন আশা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি। হঠাৎ আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান। ১৮ জুন একই দিনে কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান শামসুল হুদা (৫৫) এবং সান্দিকোনা এলাকায় প্রাণ হারান আশরাফুল ইসলাম (২৫)। এক দিনে তিনজনের মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পরিবারগুলোতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকা।
খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক বলেন, ‘হাওরে কাজ করতে গেলে আকাশের অবস্থা সব সময় বোঝা যায় না। অনেক সময় হঠাৎ মেঘ করে বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে কোনো ঘর বা নিরাপদ জায়গা না থাকায় আতঙ্কের মধ্যেই থাকতে হয়।’
এছাড়া জেলেদেরও একই অভিজ্ঞতা রয়েছে। মাছ ধরার সময় বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হলে নৌকা নিয়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় তাদের।
নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে এবং বজ্রমেঘ সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর প্রভাব রয়েছে। বজ্রপাত মূলত ‘কিউমুলোনিম্বাস’ বা সিবি মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়। এখন নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে গেছে। তাই হাওর এলাকায় তালগাছসহ উঁচু গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, হাওরের বিশাল এলাকায় শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। খোলা মাঠে কৃষক ও জেলেদের জন্য বিশেষ শেল্টার জোন বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন যেখানে আকস্মিক দুর্যোগের সময় কৃষক ও জেলেরা দ্রুত নিরাপদে যেতে পারবেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আশ্রয়কেন্দ্রে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর কারিগরি দিক ও স্থান নির্বাচন করতে মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিন পরিদর্শন করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন