প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গাজার, লেবাননের, সিরিয়ার এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক কথিত কৌশলগত বিজয় অর্জন করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তার কাঙ্ক্ষিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বিখ্যাত দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায় যে ক্ষমতা প্রয়োগ এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাধ্য করার ক্ষমতাকে আধিপত্য বলা হলেও, তা কখনোই প্রকৃত নেতৃত্ব বা সম্মতিভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী কতৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম নয়। সামরিক শক্তির মাধ্যমে ধ্বংস বা দমন করা সম্ভব হলেও, তা দিয়ে মানুষের মন জয় করা বা কোনো স্থিতিশীল ব্যবস্থা নির্মাণ করা যায় না।
ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থাকে বিচার করতে গেলে দেখা যায় তারা সামরিক শক্তিতে চরম শিখরে পৌঁছেছে। হামাসের সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া, হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে খতম করা কিংবা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের আঘাত হানার ঘটনা প্রকাশ করে তাদের সামরিক শক্তির প্রদর্শন। তবে, এই আপাত সাফল্যগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের স্থায়ী আধিপত্য বা সুদৃঢ় কাঠামোগত প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। বরং এটি উন্মোচন করে দিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এই শক্তির কোনো স্বাধীন স্থায়িত্ব নেই।
বিশ্ব অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের মাপকাঠিতেও ইসরায়েলের এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের হাই-টেক খাত এবং সাইবার সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, এগুলো মূলত বৃহত্তর মার্কিন ইকোসিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল। তেল আবিবের স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে শুরু করে দেশটির মুদ্রানীতি—সবকিছুই বৈশ্বিক অর্থনীতির বৃহত্তর স্রোতের ওপর নির্ভরশীল। এর পাশাপাশি, দেশের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা পুরোপুরি মার্কিন সহায়তার ওপর টিকে রয়েছে, যা ইসরায়েলকে একটি কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্যের আড়ালে, ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে তাদের মানবসম্পদের সংকট। বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে গত বছরগুলোতে হাজার হাজার পেশাদার ও দক্ষ ইসরায়েলি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। দেশটির নিজস্ব উদ্ভাবন কর্তৃপক্ষ সেখানে গবেষণা এবং উন্নয়নের সাথে যুক্ত জনবলের ঘাটতি নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা দিয়েছে। ফলে, দেশটির অর্থনীতি কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর নির্ভর করে টিকে রয়েছে, যার নিজস্ব ভিত্তি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরায়েলের বৈধতাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গেনোসাইডের অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হওয়া ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মনোভাবের ক্ষেত্রেও বিশাল পরিবর্তন এসেছে, যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেশটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঐতিহ্যগত মিত্র দেশগুলোতেও ইসরায়েলের সরকারি নীতি নিয়ে জনমত এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করলেও, ইসরায়েল আজ ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। সৌদি আরব ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট পথ ছাড়া স্বাভাবিকীকরণে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে, এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে মিসর, কাতার, তুরস্ক ও জর্ডানের মতো দেশগুলোর ভূমিকা অনেক বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল আজকের দিনে চাইলেও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন আঞ্চলিক বাণিজ্যের বা নিরাপত্তার নিয়মকানুন একা নির্ধারণ করতে পারছে না। তারা কেবল বাধা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখলেও, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
শক্তি প্রদর্শন এবং বৈধতার এই সংকটের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো এখন ইসরায়েলকে পাশ কেটে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করার নতুন পথ খুঁজছে। গ্যাস সরবরাহ থেকে শুরু করে আঞ্চলিক যোগাযোগ করিডোর; সবক্ষেত্রেই বিকল্প রুট এবং নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলি ইসরায়েলকে এক অপরিহার্য অংশীদার থেকে সরিয়ে একটি এড়ানো সম্ভবপর বাধায় পরিণত করছে। মার্কিন সমর্থন বা বাহ্যিক শক্তি দুর্বল হলে পুরো কাঠামোর অস্থিতিশীলতা আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
সামরিকভাবে পরাক্রমশালী হওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়া এক জিনিস নয়। ইসরায়েল সামরিক শক্তি দিয়ে হয়তো দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু তা দিয়ে অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বা সম্মতিভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরি করা সম্ভব নয়। মার্কিন নিরাপত্তার ছাতা বা সামরিক শক্তির জোরে সাময়িক প্রাধান্য বজায় রাখা গেলেও, বৈধতার এই গভীর সংকট এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর বিকল্প নেটওয়ার্ক নির্মাণের প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ মানচিত্রকে ইসরায়েলের পরিবর্তে অন্য কোনো কাঠামোর দিকেই ধাবিত করছে।
মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন