প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। বর্তমানে দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকেরই বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন), এমএড (মাস্টার অব এডুকেশন) এবং সিএডের (সার্টিফিকেট অব এডুকেশন) মতো শিক্ষকতার মৌলিক প্রশিক্ষণ নেই। সারা দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৪১ শতাংশ শিক্ষকেরই প্রশিক্ষণ নেই। এ ক্ষেত্রে মাদ্রাসাশিক্ষকদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বর্তমানে দেশে সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়া সব পর্যায়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪ হাজার ৬৪৬। তাঁদের মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৩০ জন পুরুষ এবং ৯৯ হাজার ১৬ জন নারী। মোট শিক্ষকের ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশের প্রশিক্ষণ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ পুরুষ এবং ৫২ দশমিক ৭৯ শতাংশ নারী শিক্ষক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অর্থাৎ নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৪১ শতাংশ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং ব্যানবেইসসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সারা দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০২৪ সালে শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৯। তাঁদের মধ্যে ৯২ হাজার ৪৯২ জন ছিলেন নারী। মোট শিক্ষকের ৬৬ দশমিক ১ শতাংশ বা ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫১ জন প্রশিক্ষিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নারী শিক্ষকদের ৬০ শতাংশ বা ৫৫ হাজার ৪৯২ জন প্রশিক্ষিত ছিলেন। তা ছাড়া, ২০২৫ সালে দেশে মাদ্রাসাশিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫। তাঁদের মধ্যে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ শতাংশ। আর ২০২৪ সালে মাদ্রাসাশিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২২। তখন মোট শিক্ষকের মাত্র ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রশিক্ষিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, দেশে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ১৫১। তাঁদের মধ্যে ২০ শতাংশ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নেই। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সব মিলিয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষক পাঠদান করছেন। আর বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হিসাব করা হলে প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
মূলত উল্টো প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ দেশে আগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, এরপর তাঁরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেকেই তা গ্রহণ করেন না। ফলে শিক্ষকতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করেই অনেকে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা যথাযথভাবে পাঠদান করতে না পারায় শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে না। তা ছাড়া, এ দেশের বেশির ভাগ বিদ্যালয়ই বেসরকারি। এসব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরীক্ষার মাধ্যমে এসব শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও ওই পরীক্ষা শিক্ষকতার প্রশিক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
সূত্র আরও জানায়, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং শিখনঘাটতি দূর করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখন ত্বরান্বিতকরণ’ (লেইস) প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯০ জন শিক্ষককে বিভিন্ন মেয়াদে ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নবীন শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নেতৃত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সমন্বিত শিক্ষা, গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। বর্তমানে আরও ২ হাজার ২৬০ জন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। দেশের ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যদিও এই প্রশিক্ষণ মৌলিক ফাউন্ডেশন কোর্স নয়।
এদিকে, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা পান। অথচ সরকারি অধিকাংশ চাকরিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের হলে সংশ্লিষ্ট পদ সাধারণত দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাভুক্ত হয় এবং ১০ম বা ১১তম গ্রেডে বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের হলেও চাকরিটি তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদায় রয়েছে। প্রশিক্ষণবিহীন অবস্থায় তাঁরা ১৪তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলে ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। দেশের সাড়ে ৩ লাখ সহকারী শিক্ষকের মধ্যে এ নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা তাঁদের বেতন স্কেল ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার দাবিতে আন্দোলন করছেন।
অন্যদিকে, এ প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী জানান, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই, এমনকি ভারতেও, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এ দেশেও ওই ব্যবস্থা চালু হলে প্রার্থীরা নিজ উদ্যোগেই প্রশিক্ষণ নেবেন। এখন এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে, ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে যেসব শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নেই, তাঁদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান যাতে শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন