প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের জাফনার চেম্মানি অঞ্চলে একটি গণকবর থেকে ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে শিশু ও নবজাতকও রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে শ্মশান সম্প্রসারণের জন্য খননকাজের সময় শ্রমিকরা প্রথম মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান।
আগস্ট মাসে খননের তৃতীয় ধাপে প্রত্নতত্ত্ববিদরা এসব কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করেন। সেখানে চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও দুধের বোতলের মতো ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গেছে। এটি শ্রীলঙ্কায় আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটির কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধের সময় চেম্মানিতে গণকবর থাকার অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন ও অধিকারকর্মীরা ধারণা করছেন, এখানে যুদ্ধের সময় নিহত বেসামরিক মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে।
নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারগুলো দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশা, এই গণকবর থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা প্রিয়জনদের ভাগ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। তামিলদের একটি অংশ বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করছে। তবে ধীরগতির খননপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে উদ্বেগের কারণে চেম্মানি আবারও প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিলেন তামিল। নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে সেনাবাহিনী জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর চেম্মানি এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ে। সেখানে সেনা ক্যাম্প ও চেকপয়েন্ট স্থাপন করা হয়। একই সময়ে বহু বেসামরিক মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
নিখোঁজদের একজন ছিলেন কান্দাইয়া জয়পালান। ১৯৯৬ সালে চেম্মানির কাছে একটি চেকপয়েন্ট থেকে সেনাবাহিনী তাকে আটক করে নিয়ে যায় বলে তার মেয়ে জেয়ারুবি জয়পালান জানান। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। এর আগে একই এলাকায় তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পাঁচ সেনাসদস্যের মৃত্যুদণ্ড হয়। পরে চেম্মানি এলাকায় তার মরদেহ ও পরিবারের সদস্যদের মরদেহ পাওয়া যায়।
এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্য পরে দাবি করেন, চেম্মানিতে ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল। এর পর ১৯৯৯ সালে সেখানে খনন চালিয়ে ১০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে নতুন করে আবিষ্কৃত গণকবরটি আগের স্থানটির কাছেই হওয়ায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকারকর্মীরা পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি করছেন।
শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেহাবশেষগুলোর বেশিরভাগই অগভীর ও ঘনভাবে সমাহিত ছিল। কমিশনের মতে, এসব সমাহিতকরণ অবৈধ হওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
চেম্মানিতে নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো প্রতিবাদ ও স্মরণানুষ্ঠান করছে। তারা আশা করছে, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় জানা যেতে পারে। ৬৫ বছর বয়সী সুসিলা ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর হাতে নিখোঁজ হওয়া তার একমাত্র ছেলে জ্ঞানাসীলান রবির সন্ধান করছেন। তিনি বলেন, ছেলেকে ছাড়া তার জীবন শূন্য হয়ে গেছে।
চেম্মানি থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলো বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের হেফাজতে রয়েছে। এখনো ডিএনএ পরীক্ষা শুরু হয়নি। প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানান, দেহাবশেষের বয়স ও মৃত্যুর কারণ জানতে আরও পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজনে কিছু নমুনা বিদেশেও পাঠানো হতে পারে।
গত কয়েক দশকে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন স্থানে ২০টির বেশি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। তবে এসবের কোনোটিই জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা যায়নি। এ কারণে নতুন তদন্ত নিয়েও অনেক তামিল পরিবারের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
২০১৮ সালে মান্নারে পাওয়া একটি গণকবর থেকে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার হলেও তদন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। পরিবারগুলো এবার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহি চায়। সরকার বলছে, চেম্মানির তদন্তে তারা সহযোগিতা করছে। বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা জানান, খননকাজ অব্যাহত থাকবে এবং দেহাবশেষের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।
নিখোঁজদের পরিবারের কাছ থেকেও ডিএনএ নমুনা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী গণহত্যার পর বেসামরিকদের চেম্মানিতে কবর দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হবে।
শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধকালীন নিখোঁজ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। আন্তর্জাতিক চাপের পর ২০১৮ সালে নিখোঁজদের সন্ধানে অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স (ওএমপি) গঠন করা হয়। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সংস্থাটি এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও হত্যার বহু মামলা এখনও ঝুলে আছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা হুমকি ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
জাতিসংঘ শ্রীলঙ্কাকে নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা তদন্তের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে। তবে শ্রীলঙ্কার পরপর কয়েকটি সরকার যুদ্ধকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সরকারের সামনে এখন অতীতের বিলম্ব ও অস্বীকারের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। নিখোঁজ ছেলে জ্ঞানাসীলান রবির সন্ধানে থাকা সুসিলা বলেন, ‘আমি জানি না এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে আর কতদিন বাঁচব, কিন্তু আমি এর একটা শেষ দেখতে চাই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন