প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নে আনিসা ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর ২১ বছর বয়সী প্রসূতি বৈশাখী রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ১০ সেপ্টেম্বর ক্লিনিকটিতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু ঘটে। নিহতের স্বজনেরা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। একই ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পর আরও কয়েকজন রোগীর গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
নিহত বৈশাখী রায় মৃত দিনবন্ধু রায়ের মেয়ে। তাঁর স্বামী বাধন ঘোষ অভিযোগ করেছেন যে, আনিসা ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর থেকেই বৈশাখীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। চার দিন পর তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাধন ঘোষ বলেন, "আমার স্ত্রীর আগে কিডনির কোনো সমস্যা ছিল না। সিজারের পর থেকেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর জানতে পারি, তার কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমার সন্তান মাকে হারিয়েছে।"
বাধন ঘোষের অভিযোগ, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহম্মেদ আনিসা ক্লিনিকে তাঁর স্ত্রীর অস্ত্রোপচার করেন। তিনি দাবি করেন, অস্ত্রোপচারের সময় বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সহকারী ছিলেন না। বাধন আরও জানান, চিকিৎসকের প্রভাব ও সম্ভাব্য হয়রানির আশঙ্কায় তাঁরা কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি।
বৈশাখীর মৃত্যুর পাশাপাশি আনিসা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পর আরও কয়েকজন রোগীর গুরুতর জটিলতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চার মাস আগে ওই ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করানো বেবী খাতুনের স্বামী ফারুক মোল্লা অভিযোগ করেছেন, তাঁর স্ত্রীর পেটে অস্ত্রোপচারের গজ বা কোনো সরঞ্জাম রয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর স্ত্রীর মূত্রনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফারুক জানান, "বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করাতে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বেবী খাতুনের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।"
আরেক রোগী পলি দাসের স্বামী পঞ্চানন দাস অভিযোগ করেছেন, অস্ত্রোপচারের পর তাঁর স্ত্রীর মূত্রনালি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে অন্য হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে পাইপ বা স্টেন্ট বসাতে হয়। তিনি জানান, "খুলনার সিটি মেডিকেলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং ভারতে চিকিৎসা করাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তারপরও তাঁর স্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ হননি।"
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা অসহায় বোধ করছেন। তাঁরা এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ফটকের সামনে অবস্থিত আনিসা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি প্রায় দেড় বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্লিনিকটির পরিচালনার সঙ্গে ডা. সুজাত আহম্মেদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনের বিবরণ অনুযায়ী, সেখানে সিজারিয়ান, অ্যাপেন্ডিসাইটিসসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচার করানো ১২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তবে পরিদর্শনের সময় কোনো চিকিৎসক বা নার্সকে পাওয়া যায়নি। রোগীদের কেউ ছোট খাটে, কেউ মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে ছিলেন। স্বাভাবিক প্রসবের কক্ষের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ক্লিনিকের অস্ত্রোপচারকক্ষের টিনের ছাউনি, দেয়ালের খসে পড়া পলেস্তারা এবং অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার। সেখানে আধুনিক অস্ত্রোপচার-সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা বলে দাবী ভুক্তভোগীদের। অস্ত্রোপচার-সংক্রান্ত ফরম ও পরবর্তী চিকিৎসাপত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের নাম, স্বাক্ষর এবং অপারেশন নোট না থাকার অভিযোগও উঠেছে।
পরিদর্শনের সময় ক্লিনিকটিতে নিবন্ধিত ডিপ্লোমাধারী নার্স, ব্যবস্থাপক কিংবা ল্যাব টেকনিশিয়ানকে পাওয়া যায়নি। তানিয়া নামে এক নারীকে রোগীদের বিভিন্ন কাজ করতে দেখা যায়। তিনি কখনো নিজেকে নার্স, কখনো চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে পরিচয় দিলেও তাঁর নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন বা লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধনপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ডা. সুজাত আহম্মেদ নিজেই অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি রোগীদের অ্যানেস্থেসিয়া বা অচেতন করার ওষুধ প্রয়োগ করেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহম্মেদের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেলে সটকে পড়েন। বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁকে খুদে বার্তা পাঠালেও কোন প্রতিউত্তর দেননি।
তাঁর বিরুদ্ধে সাবেক সিভিল সার্জন থাকাকালে নিয়োগে ঘুষ গ্রহণসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানাগেছে।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেছেন, "উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত আনিসা ক্লিনিকের অনিয়ম, নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা ও রোগীদের শারীরিক ক্ষতির বিষয়ে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সরেজমিনে পরিদর্শন করে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেছেন, "বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক ছাড়া অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসাসেবার নীতিমালা ও প্রযোজ্য বিধিবিধানের পরিপন্থী। আনিসা ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু এবং অন্য রোগীদের অঙ্গহানির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বৈশাখী রায়ের মৃত্যু এবং অন্য রোগীদের অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতার অভিযোগের পর আনিসা ক্লিনিকের নিবন্ধন, জনবল, অস্ত্রোপচারকক্ষের পরিবেশ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও রোগী ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, প্রতিটি ঘটনার চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে অনিয়ম বা চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন