প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মার্কিন বিমানবাহিনীর এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার কর্নেল 'ডুড ৪৪ ব্রাভো' ইরানের মাটিতে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর প্রায় ৫০ ঘণ্টা গুরুতর আহত অবস্থায় একা লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের '৬০ মিনিটস' প্রোগ্রামে জানান, প্যারাশুট ব্যর্থতার কারণে তীব্র গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়ে তার মেরুদণ্ড ও হাত ভেঙে গেলেও তিনি মনের জোরে পাহাড়ে আত্মগোপন করে ছিলেন। পরবর্তীতে বিশেষ উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় তিনি নিরাপদে ফিরে আসেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২ এপ্রিল ইরানের একটি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়। ওই দুই আসনের যুদ্ধবিমানে পাইলট ‘আলফা’ এবং ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার ‘ব্রাভো’ (যিনি মার্কিন বাহিনীর একজন কর্নেল) ছিলেন। এ কারণে বিমানে থাকা দুই কর্মকর্তা প্যারাসুট নিয়ে ইরানের ভূখণ্ডে অবতরণ করতে বাধ্য হন।
বিমানে আচমকাই ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। ব্রাভোর কথায়, ‘মনে হয়েছিল একটি প্রচণ্ড গতির মালবাহী ট্রেন এসে সজোরে ধাক্কা দিল বিমানে।’ দ্রুতই পরিষ্কার হয়ে যায়, জেটটিকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে দু’জনকেই ইজেক্ট করতে হয়।
বিমানের পাইলট, যাকে ‘আলফা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার হন। তবে অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ‘ব্রাভো’ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
মাঝআকাশে প্যারাশুটের দিকে তাকিয়ে ব্রাভো দেখতে পান, সেটি ঠিকমতো খুলছে না। সেই মুহূর্তের কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম প্যারাশুট খুলছে না। সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্ত।’
তাঁর অনুমান, ওই অবস্থায় প্যারাশুট ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৭০ থেকে ১০০ মাইল গতিবেগে প্রায় ৫ মাইল দূরে গিয়ে ছিটকে পড়েন। পাহাড়ি এলাকায় আছড়ে পড়ায় ভেঙে যায় তাঁর পিঠের শিরদাঁড়া, একটি হাতও। কাঁধেও লাগে গুরুতর চোট। কেটে ছড়ে যায় মাথা ও মুখ। শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষরণ।
এত আঘাতের পরেও থামেননি ব্রাভো। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শত্রু এলাকায় এক জায়গায় থাকলে ইরানের বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাবেন। সেই সময় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ইরানি সেনা ও সশস্ত্র গোষ্ঠী তাঁর খোঁজে ওই ১০ মাইলের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছিল। টিভিতে তাঁর মাথার দামও ঘোষণা করা হয়। ব্রাভো বলেন, ‘ইরানি টেলিভিশনে বন্দি হিসেবে নিজের মুখ দেখানোর ভয়েই আমি থামিনি।’
সামনে ছিল পাহাড়ে ঘেরা একটি উপত্যকা। ভাঙা পিঠ ও হাত নিয়েই তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি জায়গায় উঠে যান। পরে পাহাড়ের একটি খাঁজে আশ্রয় নেন। খাবার বা পানি প্রায় কিছুই ছিল না। তার উপরে যন্ত্রণা কয়েকগুণ বেড়ে যায় ঠান্ডায়।
অল্প অল্প বিশ্রাম নিয়ে অকুতোভয় ওই মার্কিন অফিসার বারবার অবস্থান বদল করেন। যাতে ইরানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে সঙ্কেত পাঠাতে থাকেন। প্রায় ২৪ ঘণ্টা তিনি কোথায় আছেন খোঁজ ছিল না মার্কিন বাহিনীর কাছে।
অন্যদিকে আমেরিকায় তখন শুরু হয়ে গিয়েছিল বিশাল উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা। গত ৪৬ বছরে এই প্রথম ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে কোনও মার্কিন সেনা উদ্ধার অভিযান চালায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে মাঝরাতে যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের খবর জানানো হয়। সিদ্ধান্ত হয়—দু’জন সেনাকে খুঁজে বের করতেই হবে। শতাধিক সেনা, বহু বিমান ও ড্রোনকে কাজে লাগানো হয়। আমেরিকান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মাটিতে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে। আকাশে ছিল শতাধিক যুদ্ধবিমান ও ড্রোন।
ব্রাভোকে খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাঁদের গতিবিধি চিহ্নিত করতে গোপন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে ডিসেপশন ক্যাম্পেনও চালানো হয়। তাঁর লুকিয়ে থাকার জায়গার কাছে ইরানের আইআরজিসি বাহিনীর উপরে মার্কিন বিমানবাহিনী হামলা চালায়। এর পরেই শুরু হয় চূড়ান্ত উদ্ধার অভিযান।
শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ ঘণ্টা পরে ব্রাভোর কাছে পৌঁছায় মার্কিন উদ্ধারকারী দল। সেই মুহূর্তটিকে নিজের জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। বাড়ি ফেরার পরে স্ত্রীকে ফোন করে নিজের বেঁচে থাকার খবর জানান ব্রাভো। তাঁর মতে, এই ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বেঁচে ফেরার গল্প নয়—এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ, সহযোদ্ধাদের আস্থা, নেতৃত্ব এবং ‘কাউকে পিছনে না ফেলে আসার’ মার্কিন সামরিক প্রতিশ্রুতির উদাহরণ। এত চোট-আঘাত, যন্ত্রণা সত্ত্বেও মনের জোর হারাননি তিনি। উদ্ধারকারী দল যখন তাঁর কাছে পৌঁছায়, ব্রাভো মুখ ফুটে একটি কথাই বলেছিলেন— ‘চলো যাওয়া যাক।’ মার্কিন সেনার এই অভিযান ও তাঁর বেঁচে ফেরা দুটোকেই শুরু একটা কথাতেই ব্যাখ্যা করছেন বিশেষজ্ঞরা— ‘মিরাকল।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন