প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি পর্যায়ে গিয়ে শান্তি রক্ষার জন্য করা কোনো চুক্তিও এমন মনে হতে পারে, যেন তা খারাপ আচরণকে পুরস্কৃত করছে। ভারতের কাছে সেই মুহূর্তটি আসে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল। জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন ২৬ জন। নয়াদিল্লি এই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের দায়ী করে। এরপর ভারত ঘোষণা দেয়, ছয় দশকের বেশি পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখা হবে- যত দিন না পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ করে।
বার্তাটি ছিল স্পষ্ট। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সুবিধাকে আর নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখবে না ভারত। এবার সেই বিতর্ক গড়িয়েছে দ্য হেগে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনে সিন্ধু পানি চুক্তির অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত রায় দেন, চুক্তিটি এখনো কার্যকর এবং ভারতের একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত চুক্তিকে স্থগিত বা বাতিল করতে পারে না। একই সঙ্গে ভারতের রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অন্তর্বর্তী কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়।
পাকিস্তান এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, তারা কখনোই এই সালিসি আদালতকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত- চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত- নিয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ারও এই ট্রাইব্যুনালের নেই। আইনি লড়াই হয়তো চলবে। কিন্তু এর বাইরে একটি বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি দেশ কেন এমন একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সব সুবিধা বজায় রাখতে বাধ্য থাকবে, যদি তার বিশ্বাস হয় যে অপর পক্ষ একই সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে এবং তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু 'pacta sunt servanda'- অর্থাৎ চুক্তি অবশ্যই মানতে হবে, নীতির কথা বললেই শেষ হয়ে যায় না। অবশ্যই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির প্রতি সম্মান না থাকলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশৃঙ্খলায় পড়ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন কখনোই চুক্তিকে এমন কোনো পবিত্র বস্তু হিসেবে দেখেনি, যা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন বা স্থগিত করা যাবে না। চুক্তিবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনে বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত বা বাতিলের কিছু ভিত্তি স্বীকৃত আছে- যেমন গুরুতর চুক্তিভঙ্গ বা পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন।
সেই মানদণ্ড ইচ্ছাকৃতভাবেই কঠোর। কিন্তু কঠোর মানে অসম্ভব নয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইতিহাসেও দেখা যায়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশগুলো কখনো কখনো দীর্ঘদিনের চুক্তিগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে করা অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, ১৯৭২ সালে চুক্তিটি সইয়ের পর আন্তর্জাতিক কৌশলগত পরিবেশ আমূল বদলে গেছে এবং নতুন বাস্তবতা তাদের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস বা আইএনএফ চুক্তি থেকেও সরে আসে। তাদের অভিযোগ ছিল, রাশিয়া চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে এবং সেই পরিস্থিতিতে চুক্তির মধ্যে থেকে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই সিদ্ধান্তগুলোর পক্ষে বা বিপক্ষে মত থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার- রাষ্ট্রগুলো সাধারণত চুক্তিকে আত্মঘাতী বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেলে সরকারগুলো অতীতে নেওয়া প্রতিশ্রুতিও নতুন করে মূল্যায়ন করে। ভারত বলতে পারে, একই নীতি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
পানি শুধু পানি নয়
সমালোচকদের যুক্তি ভিন্ন। সিন্ধু পানি চুক্তি একটি পানিবণ্টন চুক্তি, সামরিক বা নিরাপত্তা চুক্তি নয়। তাই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এর কার্যকারিতার সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। কিন্তু এই যুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। এ অঞ্চলে পানি শুধু পানি নয়। সিন্ধু নদ অববাহিকা পাকিস্তানের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির প্রাণভোমরা। ১৯৬০ সালের চুক্তিতে সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব- এই পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি মূলত পাকিস্তানের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়। অন্যদিকে ভারতকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়। পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের অধিকতর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়। ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিয়েছে।
দেশভাগের পর বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও টিকে আছে। স্বাধীনতার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। কিন্তু টিকে থাকা মানেই অপরিবর্তনীয় থাকা নয়। ১৯৬০ সালের ভারত ও পাকিস্তান আর ২০২৬ সালের ভারত ও পাকিস্তান এক বাস্তবতায় নেই। জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন নতুন সংকট তৈরি করেছে। পানির ঘাটতি, জ্বালানির চাহিদা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে গেছে।
ভারতের যুক্তি হলো, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে দুই দেশের সম্পর্কের চরিত্রে। নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে পাহেলগাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে মুম্বাই, উরি, পুলওয়ামা ও পাহেলগামসহ বিভিন্ন হামলায় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছে। পাকিস্তান অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। ভারত পাহেলগাম হামলার ঘটনায় পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবা ও টিআরএফ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের কথাও বলেছে। পাকিস্তান এখনো কোনো ধরনের দায় স্বীকার করেনি। এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ শুধু কূটনৈতিক বিতর্ক নয়। সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার পেছনে ভারতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত যুক্তিরও অংশ।
ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি কোথায়
ভারতের অবস্থানকে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে- সন্ত্রাসবাদ ঘটলেই কোনো চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। এমন দাবি টেকসই নয়। বরং ভারতের যুক্তি একটি সামগ্রিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বারবার সন্ত্রাসী হামলা, পাকিস্তানভিত্তিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে ভারতের অভিযোগ, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি এবং পুরো আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তন- সব মিলিয়ে সেই পরিস্থিতি আর নেই, যে পরিস্থিতিতে সিন্ধু পানি চুক্তির জন্ম হয়েছিল। ভারতের যুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা সম্ভবত এটিই।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে- চুক্তি স্থগিত করা এবং চিরতরে বাতিল করে দেওয়া এক বিষয় নয়। ভারত এখনো বলেনি যে সিন্ধু পানি চুক্তির অস্তিত্ব চিরতরে শেষ। তারা বলছে, চুক্তিটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের আচরণের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ দরজাটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলালে ভবিষ্যতে সহযোগিতা আবার শুরু হতে পারে। ভারতের বক্তব্য তাই এমন নয় যে চুক্তির কোনো মূল্য নেই। বরং তাদের যুক্তি হলো, সহযোগিতার যেমন সুবিধা আছে, তেমনি বিশ্বাস ধ্বংসেরও পরিণতি আছে।
দ্য হেগের সালিসি আদালত অবশ্য ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তাদের মতে, ভারত যে কারণগুলো দেখিয়েছে, তা চুক্তি স্থগিত বা বাতিলের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু আদালতের কোনো রায় কি এমন জায়গায় বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে, যেখানে বিশ্বাসই আর অবশিষ্ট নেই? আন্তর্জাতিক আইনকে এত যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত কি না, সেটিও প্রশ্ন। কারণ, কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার নিরাপত্তা পরিবেশ মৌলিকভাবে বদলে গেছে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়ার কোনো অর্থবহ সুযোগ কি থাকা উচিত নয়?
শান্তি কি একপক্ষের দায়িত্ব?
যারা ভারত ও পাকিস্তানকে সংলাপ ও সহযোগিতা বজায় রাখার আহ্বান জানান, তাদের বক্তব্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। পানি সহযোগিতা জরুরি। চুক্তির স্থিতিশীলতা জরুরি। আঞ্চলিক শান্তিও জরুরি। কিন্তু স্থিতিশীলতার অর্থ কি এই যে একটি পক্ষ তার কাছে মৌলিক নিরাপত্তা হুমকি মনে হওয়া সত্ত্বেও সহযোগিতার সব সুবিধা অব্যাহত রাখবে? শান্তি একতরফা দায়িত্ব হতে পারে না। ভারতের দৃষ্টিতে, পাকিস্তান যদি সিন্ধু পানি চুক্তিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে শুধু দ্য হেগে আরেকটি আইনি প্রক্রিয়া শুরু করলেই হবে না। যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিস্থিতির কারণে চুক্তিটি ভারতের কাছে ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে, তার সমাধান করতে হবে।
ভারতের কাছে এর অর্থ সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের অবসান এবং পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে ভারতের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে আর কোনো হুমকি তৈরি হবে না- এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা। পাকিস্তানের জন্য এর অর্থ হতে পারে, ভারতের কৌশলগত ধৈর্যেরও একটি সীমা আছে- সেটি স্বীকার করা। সিন্ধু পানি চুক্তি জন্ম নিয়েছিল ভিন্ন এক দক্ষিণ এশিয়ায়। সেসময় ভারত রাজনৈতিক বৈরিতার বাইরে পানি সহযোগিতাকে আলাদা করে রাখতে রাজি হয়েছিল এই আশায় যে সহযোগিতা হয়তো একদিন সম্পর্ক উন্নয়নের পথ তৈরি করবে। সেই আশা বারবার পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
পাহেলগামের শিক্ষা তাই ভারতের দৃষ্টিতে এই নয় যে চুক্তির কোনো মূল্য নেই। বরং শিক্ষা হলো, কোনো চুক্তিকে তার স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর আচরণ থেকে অনন্তকাল বিচ্ছিন্ন করে রাখা যায় না। সিন্ধু পানি চুক্তি যুদ্ধের মধ্যেও টিকে আছে- এটি সত্য। কিন্তু টিকে থাকা আর চিরস্থায়ী হওয়া এক বিষয় নয়। ৬৬ বছরের পুরোনো একটি চুক্তিকে জাদুঘরের নিদর্শনের মতো অপরিবর্তনীয় ধরে নেওয়া যায় না, যখন তার চারপাশের কৌশলগত, পরিবেশগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। পানি হয়তো চুক্তির নিয়ম মেনে সীমান্ত অতিক্রম করে। বিশ্বাস করে না। পাকিস্তান যদি চুক্তিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে সেই প্রত্যাবর্তন শুধু দ্য হেগের আদালতে জেতা যাবে না। বাস্তব পৃথিবীতে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে- যে আস্থা একসময় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাকে সম্ভব করেছিল।
সেই আস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত ভারতের কাছে পাহেলগামের পরও সবকিছু অপরিবর্তিত রয়েছে- এমন আচরণ প্রত্যাশা করা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান নয়। বরং সেটি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার দাবি। আর কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের কাছ থেকে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার এমন প্রত্যাশা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিই এখন সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সৌজন্যে- কালের কণ্ঠ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন