প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর এক বছর পর সংশ্লিষ্ট সংঘাতের বিষয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘যুদ্ধ’ চলাকালীন ইসলামাবাদকে সাহায্য করেছে ইরান।
ইরানকে নিয়ে ইসহাক দারের এই বিস্ফোরক মন্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন পাকিস্তানকে ‘খোলাখুলি সমর্থন’ দিয়েছে তেহরান। তার দাবি, এই কারণেই তিনি গত বছর চার দিনের ‘যুদ্ধ’ থামার পর তেহরান সফর করেন। অন্যদিকে, ইরান এই বিষয়ে ‘মুখ বন্ধ’ রাখায় সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটির পার্লামেন্টে একটি লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ইসহাক দার ইরান প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি জানান, ‘২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ব্যাপকভাবে ইসলামাবাদকে সাহায্য করেছে তেহরান।’ তবে তিনি স্পষ্ট করেননি যে, এটি সামরিক, গোয়েন্দা তথ্য, না অন্য কোনো ধরনের সহায়তা ছিল।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে ইরান। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদি সেনারা আবারও তেহরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে নামে। এরপর থেকে গত ছয় মাসে ইরানে লাগাতার বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। ইসহাক দার জানান, এই যুদ্ধে পাকিস্তান তেহরানের পাশে দাঁড়াতে দেরি করেনি, ফলে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।
পাক উপপ্রধানমন্ত্রী তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের এই দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা যায় না। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের সময় বেশ কিছু উপগ্রহচিত্র প্রকাশ্যে আসে। সেগুলোতে দেখা যায়, মার্কিন আক্রমণের সময় ইসলামাবাদের ঘাঁটিতে কিছু সামরিক বিমান লুকিয়ে রেখেছিল ইরান। এর ফলে তেহরান লড়াকু জেট ধ্বংসের ঝুঁকি এড়াতে সক্ষম হয়।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ইসহাক দার ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ব্যাপারে আংশিক সত্য বলছেন। কারণ, গত বছরের এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিরীহ নাগরিকের মৃত্যু হলে ইসলামাবাদ সফর করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি সেখান থেকে দ্রুত নয়াদিল্লি চলে যান এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন।
নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদ, দু’জায়গাতেই আরাঘচির বক্তব্যে একই সুর ছিল। তিনি সন্ত্রাসবাদের তীব্র সমালোচনা করেন এবং সামরিক সংঘাতে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেন। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। মে মাসে পহেলগাঁও হামলার প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের জম্মু-কাশ্মীরের (পিওজেকে) নয়টি জঙ্গি ক্যাম্প ধ্বংস করে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
ভারতীয় সেনাবাহিনী ওই অভিযানের সাংকেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখে। জঙ্গি ক্যাম্পে হামলা শুরু হলে ইসলামাবাদ পাল্টা প্রত্যাঘাতের চেষ্টা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী লড়াকু জেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে হামলা চালায়। ভারতীয় বাহিনী রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংস করে।
ভারত রুদ্রমূর্তি ধারণ করার পর পাকিস্তান সেনা সংঘর্ষবিরতির অনুরোধ জানায়। দিল্লি সেই অনুরোধে সাড়া দিলে ‘যুদ্ধ’ বন্ধ হয়। যুদ্ধ থামার পর ইসলামাবাদ ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়াতে শুরু করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, রাওয়ালপিন্ডির প্রত্যাঘাতে ভারত ছয়টি যুদ্ধ বিমান হারিয়েছে। যদিও এই মিথ্যা দ্রুত ধরা পড়ে।
‘সিঁদুর’ সংঘাত থামার পর সংসদের দুই কক্ষে ভাষণ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষের সময় রাষ্ট্রপুঞ্জের ১৯৩টি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে তিন-চারটিকে বাদ দিলে বাকি সবার থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন পেয়েছে ভারত।’ পরবর্তী সময়ে সামরিক কর্তাদের কাছ থেকেও প্রায় একই বক্তব্য শোনা যায়। তারা জানান, ড্রোনসহ একাধিক অস্ত্র এবং উপগ্রহভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে পাকিস্তানকে সাহায্য করছিল চিন ও তুরস্ক।
সেনা অফিসারদের দাবি, ‘যুদ্ধ’ চলাকালীন লাগাতার ড্রোন হামলায় ভারতকে ব্যতিব্যস্ত করার পরিকল্পনা করেছিল পাকিস্তান। সামরিক অভিযান শুরুর মুখে ইসলামাবাদকে পাইলটবিহীন যান সরবরাহ করে তুরস্ক। অন্যদিকে, চীনের থেকে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিলেন রাওয়ালপিন্ডির সেনা কর্মকর্তারা। এই দুইটি দেশকে বাদ দিলে তাদের দিকে নৈতিক সমর্থন ছিল আজ়ারবাইজানেরও।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘সিঁদুর’ পর্বে ইরানের অবস্থান ছিল অনেকটাই নিরপেক্ষ। যদিও পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে তাদের সম্পর্ক বেশ মধুর। অতীতে ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ইসলামাবাদকে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র, গোলা-বারুদ এবং জ্বালানি সরবরাহ করেছে তেহরান। তাছাড়া, কাশ্মীর ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বরাবর ভারতের শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ইরান পাশে থেকেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) শেষ হতে না হতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে জড়িয়ে পড়ে। ওই সময় আমেরিকার বদান্যতায় পশ্চিম এশিয়ায় গড়ে ওঠে পাঁচ রাষ্ট্রের একটি সামরিক সংগঠন, যার নাম ‘সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা সেন্টো। ওয়াশিংটন নিজে অবশ্য এর সদস্য ছিল না। ইরাক, ইরান, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং ব্রিটেনকে নিয়ে গঠিত এই গোষ্ঠীর জন্মের তারিখ ছিল ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি।
সেন্টো তৈরির ১০ বছর পর আচমকা কাশ্মীর আক্রমণ করে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের তৎকালীন সেনাশাসক ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের পরিকল্পনা ছিল দুটি পৃথক সেনা অভিযানে ভূস্বর্গ সম্পূর্ণ দখল করা।
অপারেশন জিব্রাল্টার এবং অপারেশন গ্র্যান্ড স্লাম নামে পরিচিত সেই অভিযানে গোপনে অস্ত্র, গোলা-বারুদ ও জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি পশ্চিমি দেশগুলোর থেকে রাওয়ালপিন্ডির অস্ত্র ক্রয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে তেহরান।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়েও ইরানি ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই দুই লড়াই চলাকালীন তেহরানের কুর্সিতে ছিলেন ইরানের শেষ রাজা মহম্মদ রেজা শাহ পহেলভি। তার সাহায্য সত্ত্বেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয় পাকিস্তান। ’৬৫-তে লাহোরের দরজায় পৌঁছায় ভারতীয় বাহিনী। আর ’৭১ সালে ঢাকায় ৯৩,০০০ সৈন্যসহ আত্মসমর্পণ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লা খান নিয়াজি।
১৯৭৯ সালে ‘ইসলামীয় বিপ্লবে’ তেহরানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। ফলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে মিশরে আশ্রয় নেন মহম্মদ রেজা শাহ পহেলভি। ফলে রাতারাতি কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের হাতে চলে যায় ইরান। তখনকার ইরানের এই ভোলবদলের কারণে সেন্টো ভেঙে যায়। তবে রাজনৈতিক পালাবদল সত্ত্বেও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
গত শতাব্দীর ৮০-র দশক থেকে পাকিস্তানের ভেতরে একের পর এক জঙ্গি সংগঠন গজিয়ে ওঠে। তাদের একাংশ আফগানিস্তানে সক্রিয় ছিল। বাকিরা কাশ্মীর, পঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রসহ ভারতের একাধিক এলাকাকে রক্তাক্ত করে তোলে ইসলামাবাদ। প্রায় একই সময়ে ইরানের মদতে পশ্চিম এশিয়ায় প্যালেস্টাইনপন্থী হামাস ও হিজবুল্লার মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্ম হয়, যাদের মূল লক্ষ্য ইসরায়েলের ধ্বংস।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের জম্মু-কাশ্মীরে বিরাট সমাবেশ করে লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মহম্মদের মতো পাকিস্তান মদদপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী। সেখানে হাজির ছিলেন হামাসের বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতা। শুধু তা-ই নয়, একসময় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) তথা শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে ভূস্বর্গের স্বাধীনতার কথা বলতে শোনা যেত। তিনি ওই এলাকাকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মানতে রাজি ছিলেন না।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলায় আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হলে শোকবার্তা পাঠায় পাকিস্তান। তার শেষকৃত্যে ইসলামাবাদের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং সেনাপ্রধান (চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি, সংঘর্ষ থামাতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করছেন তারা।
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই গত ২৪ আগস্ট ফের তেহরান সফর করেন পাকিস্তান সেনাপ্রধান (চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। চলতি বছরে এটি তার তেহরান সফরের তৃতীয় বার। সেখানকার সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির একাধিক অফিসারের সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডির সেনাবাহিনীর জেনারেলদের যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই ইসহাক দারের মন্তব্য ঘিরে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।
এটি উল্লেখযোগ্য যে, ইরান সফরে মুনির যেতেই ‘সিঁদুর’ পর্বে তেহরানের সাহায্যের কথা বলতে শোনা গেল পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। গত ৭ আগস্ট তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে মক্কা চুক্তি নামের একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতায় সই করে পাকিস্তান। এর মাধ্যমে ‘ইসলামিক নেটো’ গঠনের স্বপ্ন রয়েছে তাদের। এই উদ্দেশ্যেই সাবেক পারস্যের গুণকীর্তন? উঠছে সেই প্রশ্নও।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন