প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সংসারের কাজ সামলে অবসর সময়ে দুই মাসে ৭৩০ পৃষ্ঠায় পবিত্র কোরআন শরীফ হাতে লিখে সম্পন্ন করেছেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার গৃহবধূ মোসাম্মৎ খাদিজা আক্তার (৩৫)। শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে গ্রামের শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে কোরআন শিক্ষা দিয়ে আসছেন তিনি। তাঁর এমন উদ্যোগ এলাকায় প্রশংসা কুড়িয়েছে।
খাদিজা আক্তার নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী মোহাম্মদ জজ মিয়া পেশায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক। সীমিত আয়ের সংসারে নানা ব্যস্ততার মধ্যেও ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার ও আরবি হাতের লেখার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
খাদিজার আরবি লেখার প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। একসময় নিজের হাতের লেখার চর্চা ধরে রাখতে পুরো কোরআন শরীফ হাতে লেখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামীর সহযোগিতায় সাদা কাগজ সংগ্রহ করে লেখা শুরু করেন। এরপর ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রায় দুই মাসের চেষ্টায় ৪০টি কলমের কালি ব্যবহার করে ৭৩০ পৃষ্ঠায় ৩০ পারার সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ লেখা শেষ করেন।
খাদিজার বাবার বাড়ি নেত্রকোনা সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের বেলাটি গ্রামে। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মসজিদের মক্তবে আরবি শিক্ষা নেন তিনি। পরে স্থানীয় মাওলানা আশরাফুলের কাছে কায়দা ও আমপারা শেষ করে কোরআন পড়া শুরু করেন। তাঁর সুন্দর আরবি হাতের লেখা ও শুদ্ধ তেলাওয়াত দেখে শিক্ষক তাঁকে লেখার চর্চা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন।
পরে বড় ভাই ও শিক্ষক মাওলানা আশরাফুলের সহযোগিতায় ঢাকার উত্তরার খাতুনে জান্নাত মহিলা মাদ্রাসা থেকে ২৫ দিনের মুয়াল্লিমা প্রশিক্ষণ নেন খাদিজা। গ্রামে ফিরে মক্তবে শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিরামপুরের মুকলেছ সিটি কিন্ডারগার্টেনেও আরবি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০৮ সালের শেষ দিকে জজ মিয়ার সঙ্গে বিয়ের পর আতকাপাড়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন খাদিজা। তখন এলাকায় শিশুদের আরবি শেখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তিনি নিজ উদ্যোগে বাড়িতে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর বাড়ির উঠানেই গড়ে ওঠে অনানুষ্ঠানিক একটি মক্তব।
বর্তমানে তাঁর মক্তবে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থীর নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের মতো শিশু, যাদের অধিকাংশই কন্যাশিশু, আরবি লেখা ও কোরআন তেলাওয়াত শিখতে আসে। শিক্ষার্থীদের বয়স সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শিশুদের পড়ালেও কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বেতন বা হাদিয়া নেন না খাদিজা। স্বামীর সীমিত আয়ের সংসারেও নিজের উদ্যোগে বিনা পারিশ্রমিকে এই শিক্ষাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনেও কঠিন সময় পার করতে হয়েছে খাদিজাকে। তিন পুত্রসন্তানের মধ্যে মেজো সন্তানকে হারিয়েছেন তিনি। সেই শোক সামলে পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গ্রামের শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
কেন বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের পড়ান এবং পুরো কোরআন হাতে লেখার অনুপ্রেরণা কোথায় পেয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে খাদিজা আক্তার বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তিনি এই কাজ করেন। অবসর সময় ভালো কাজে ব্যয় করা এবং নিজের হাতের লেখার চর্চা ধরে রাখাও তাঁর উদ্দেশ্য। শিশুদের পড়ানোর মাধ্যমে নিজের চর্চা বজায় থাকে, পাশাপাশি সওয়াবের আশাও করেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক বড় কোনো ডিগ্রি কিংবা আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও নিজের ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য ও নিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খাদিজা আক্তার। হাতে লিখে সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ শেষ করা এবং দীর্ঘদিন বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন