প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন মার্কেট দখল ও চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ একটি চক্রের বিরুদ্ধে উঠেছে। সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানার মতো ব্যবহার, ভাড়া দেওয়া, হাতবদল ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, জেলা পরিষদের নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করে দোকানগুলো অন্যের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকায় দখলস্বত্ব অন্যের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে, দোকানগুলোর মালিকানা একাধিক হাত বদল হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা নামে-বেনামে দখলে নিচ্ছেন। এর ফলে প্রকৃত ইজারাদার নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে রামগতি পৌর আলেকজান্ডার বাজারে শতবর্ষী পুকুর দখল করে দোতলা ও টিনশেডের দুটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়। পাকা ভবনে ৫৩টি ও টিনশেড মার্কেটে ৩২টি—মোট ৮৫টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।
২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্মাণকাজ শেষ হয়। তবে পরিষদের নীতিমালা উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনায় মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পছন্দের লোকদের মধ্যে দোকানগুলো বণ্টন করা হয়েছে। এক ব্যক্তির নামে একাধিক দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, আবার একই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী, ভাই-বোন ও ছেলের নামেও দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, দোকান বরাদ্দের আগে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করতে হবে।
পরে যাচাই-বাচাই করে প্রকৃত অসহায় ও গরিব ব্যবসায়ীদের মাসিক এক হাজার ২৫০ টাকা ইজারা ফি দিয়ে এক বছরের জন্য (একসনা) বন্দোবস্ত দিতে হবে। প্রতিবছর বন্দোবস্ত নবায়ন করতে হবে।
তবে এই নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে তারা ওই দোকান বেশি দামে অন্যের কাছে বিক্রি করেছেন এবং একেকটি দোকান একাধিকবার বিক্রি করা হয়েছে।
জেলা পরিষদের একাধিক সূত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের কাজে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন জেলা পরিষদের তখনকার সদস্য ও রামগতির আলেকজান্ডার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন।
তিনি মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের নামে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। বর্তমানে কয়েকটি দোকানের ভাড়া নিচ্ছেন আমজাদের স্ত্রী নাজনে আরা রিতা।
সরেজমিন মার্কেট পরিদর্শনকালে দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা এসব অভিযোগ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমজাদ হোসেনকে ঘিরে জেলা পরিষদের দোকান দখল, নামে-বেনামে বরাদ্দ, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দোকান হস্তান্তর ও তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির অভিযোগ এখন সবার মুখে মুখে। মার্কেটের ৮৫ দোকানের মধ্যে প্রায় ৮০টি দোকান হাতবদল হয়ে একাধিকবার বিক্রি হয়েছে। একজনের দখলে একাধিক দোকান, একজনের দোকান অন্যজনে ভাড়া তোলারও অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ মার্কেটটি আর জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি দখলবাজদের কবজায় চলে গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
এদিকে, জেলা পরিষদ কার্যালয়ে মার্কেট নির্মাণ সংক্রান্ত ব্যয়ের কাগজপত্র থাকলেও দোকান ইজারা (বরাদ্দ) নেওয়া ব্যবসায়ীদের কোনো তালিকা সংরক্ষিত নেই। ফলে প্রকৃত বরাদ্দ পাওয়াদের নামের তালিকাও জানা যায়নি। এ ছাড়া ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলা পরিষদের ফান্ডে মার্কেট থেকে কোনো রাজস্ব জমা হয়নি বলে জানা গেছে।
আলেকজান্ডার বাজারের অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ী জানান, জেলা পরিষদের নীতিমালা উপেক্ষা করে আমজাদ হোসেন স্ট্যাম্পের মাধ্যমে পজিশনভেদে একেকটি দোকান থেকে পাঁচ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায় করেন। জেলা পরিষদের রশিদ ছাড়াই নগদে টাকা নেন আমজাদ। মার্কেটের ৮৫ দোকান থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
তবে আমজাদের দাবি, এসব টাকা তিনি মার্কেট নির্মাণে ব্যয় করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, হাতিয়ে নেওয়া টাকা আমজাদ ও জেলা পরিষদের তখনকার কর্তাব্যক্তিরা ভাগাভাগি করে নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন। জেলা পরিষদ মার্কেট সরকারি সম্পত্তি হলেও তা কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে।
এদিকে, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের নব নিযুক্ত প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন সাবু সরেজমিন আলেকজান্ডার বাজারের ওই মার্কেটটি পরিদর্শন করেন। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ব্যবসায়ীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে ভাড়া না দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।
ভাড়াটিয়াদের ভাষ্য, সরকারি দোকানের মালিকানা হস্তান্তরের সুযোগ না থাকলেও ৮০টির মতো দোকান স্ট্যাম্পের মাধ্যমে একাধিকবার হাতবদল (বিক্রি) হয়েছে। বর্তমানে ওই মার্কেটের প্রতিটি দোকানের ভাড়া পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে জেলা পরিষদের ফান্ডে জমা হচ্ছে না কোনো টাকা। আলেকজান্ডার বাজারের বিসমিল্লাহ ফার্মেসির মালিক তসলিম জানান, তিনি ১৩ লাখ টাকা দিয়ে আমজাদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দুটি দোকান নিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘তখনকার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্দেশে মার্কেট নির্মাণের দায়িত্ব নিই। জনগণের কাছ থেকে নেওয়া টাকা দিয়েই মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে।’ এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে এ প্রতিবেদককে লোভ দেখান তিনি।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী আশরাফুন নাহার বলেন, ‘আমরা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে দোকান বরাদ্দের ব্যবস্থা করব।’
জেলা পরিষদের প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, মার্কেটটি জেলা পরিষদের বলা যাচ্ছে না। কারণ জেলা পরিষদের ফাইলে মার্কেটের বিস্তারিত কাগজপত্র নেই। বিগত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে অবৈধভাবে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন