প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত, থমকে যাচ্ছে শিল্প উৎপাদন; দ্রুত লাগাম না টানলে বাড়তে পারে জনঅসন্তোষ।
তীব্র গরমের মধ্যে বরিশাল নগরীতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় দিন-রাত ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। ৩০টি ওয়ার্ডের লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও।
বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১, ওজোপাডিকোর চাঁদমারী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পিক আওয়ারে বরিশাল নগরীর বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৯৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ একসঙ্গে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট—চাহিদার অর্ধেকের সামান্য বেশি বিদ্যুৎ দিয়ে চালাতে হচ্ছে পুরো নগরীর সরবরাহ ব্যবস্থা।
অফপিক সময়েও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট। ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে রেশনিং ও রোটেশন পদ্ধতিতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ওজোপাডিকো সূত্র জানায়, বরিশাল নগরীতে চাঁদমারী-১ ও আমানতগঞ্জ-২ জোনের আওতায় মোট ৩৮টি ফিডারের মাধ্যমে ৩০টি ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সরবরাহের তুলনায় চাহিদার বিশাল ব্যবধান থাকায় একটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখতে গিয়ে অন্য এলাকায় সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে নগরবাসীর কাছে বিদ্যুৎ এখন নিয়মিত সেবার পরিবর্তে অনিশ্চিত এক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাপটিস্ট মিশন রোড এলাকার বাসিন্দা সোহান, রাহাত ও মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগে তুলনামূলক সহনীয় ছিল। কিন্তু আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখন দিন-রাত বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।
তাঁদের ভাষ্য, সরকারের যেকোনো মেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা জনগণের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁরা বলেন,বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু ‘ঘাটতি’ বলে ব্যাখ্যা করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জনগণ সমস্যার কারণের পাশাপাশি সমাধানও দেখতে চায়।** দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে না আনতে পারলে জনদুর্ভোগের সঙ্গে জনঅসন্তোষও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীতেও। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিসিক শিল্পনগরীর উদ্যোক্তা তাফস জানান, বিদ্যুৎ লোডশেডিং হওয়ার কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি চালু ও বন্ধ করতে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ওজোপাডিকো বরিশাল-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে বরিশালের চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ৩৮টি ফিডারে রোটেশন পদ্ধতিতে সরবরাহ দিতে হচ্ছে। এক এলাকায় বিদ্যুৎ চালু রাখলে অন্য এলাকায় সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি না কমলে স্থানীয়ভাবে পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি করা কঠিন।
বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে জাতীয় গ্রিডের ঘাটতির বিষয়টি সামনে আনা হলেও নগরবাসীর প্রশ্ন, তীব্র গরমের মধ্যে দিনের পর দিন এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে?
বিদ্যুৎ মানুষের বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শুধু বাসাবাড়ির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই নয়—শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু জনজীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ‘লোডশেডিং’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বরিশাল নগরবাসীর এখন একটাই দাবি—বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যার পাশাপাশি দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চলমান জনদুর্ভোগ একপর্যায়ে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষে রূপ নিতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই কি বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন