প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কের পাশে ও নোঙর এলাকার সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি সাবাড় করার কাজ চলছে। শ্রমিকদের ব্যবহার করে কোনো প্রকার গোপনীয়তা ছাড়াই পাহাড়ের মাটি কেটে ট্রাক ও ঠেলাগাড়িতে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে একদিকে পাহাড় ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে ভূমিধসের সম্ভাবনা বাড়ছে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে এমন কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ছবিতে পাহাড় কাটার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের একটি অংশ কেটে গভীর গর্ত তৈরি করা হয়েছে। কাটা পাহাড়ের মাটি সরানোর জন্য একাধিক ঠেলাগাড়ি ও মাটি কাটার সরঞ্জাম রাখা হয়েছে। পাহাড়ের ঢাল কেটে প্রায় খাড়া করে ফেলা হয়েছে। কোথাও কোথাও মাটি কাটার ফলে পাহাড়ের ওপরের অংশও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও জায়গা সমতল করার সঙ্গে জড়িত একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। সুযোগ বুঝে তারা পাহাড়ের মাটি কেটে নেয়। কখনো শ্রমিকদের দিয়ে হাতে-হাতে মাটি সরানো হয়, আবার কখনো বিভিন্ন যানবাহনে করে কাটা মাটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে ধীরে ধীরে ছোট-বড় পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
পাহাড় কাটায় বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি
পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল কেটে ফেলার কারণে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির পানি পাহাড়ের কাটা অংশে প্রবেশ করলে মাটি নরম হয়ে ধসের সৃষ্টি করতে পারে। এতে আশপাশের বসতি, সড়ক ও মানুষের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কক্সবাজারে পাহাড়ধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এর পরও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও ফের শুরু হয় একই তৎপরতা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাইপাস সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপথের পাশে কীভাবে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা সম্ভব হচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দিনের বেলায় শ্রমিক লাগিয়ে পাহাড় কাটার মতো কর্মকাণ্ড যদি চলতে পারে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কাটার নেপথ্যে শুধু শ্রমিকরা নয়; এর সঙ্গে জমির মালিক, দখলদার, মাটি ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যোগসূত্র থাকতে পারে। তাই শুধু ঘটনাস্থল থেকে শ্রমিক ধরে বা সরঞ্জাম জব্দ করে অভিযান শেষ করলে পাহাড় কাটা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
সচেতন মহলের দাবি, বাইপাস সড়কের পাশে ও নোঙর এলাকায় যেখানে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে, সেখানে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করা হোক। কারা পাহাড় কাটছে, কার মালিকানাধীন বা দখলে থাকা জায়গায় কাটাকাটি চলছে, কাটা মাটি কোথায় যাচ্ছে এবং এর পেছনে কারা অর্থ ও নির্দেশনা দিচ্ছে—এসব বিষয় অনুসন্ধান করা জরুরি।
পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে পাহাড়খেকো চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে কাটা পাহাড়ের পরিমাণ নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশ্যে পাহাড় কাটা হচ্ছে কি না তা যাচাই এবং ভবিষ্যতে যাতে ওই এলাকায় আর পাহাড় কাটা না হয়, সে জন্য স্থায়ী নজরদারির দাবি উঠেছে।
কক্সবাজারের পাহাড় ও বনাঞ্চল রক্ষা শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। পাহাড় কেটে বসতি, স্থাপনা কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া হলে একসময় এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হতে পারে।
তাহলে বাইপাস সড়কের পাশে পাহাড় কাটার এ অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে জেলার অন্যান্য এলাকায় অভিযান পরিচালনা, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং পাহাড় কাটার নেপথ্যের মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাদের মতে, পাহাড় কেটে সাবাড় হওয়ার পর অভিযান নয়—পাহাড় কাটার সময়ই প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কক্সবাজারের অবশিষ্ট পাহাড়ও একদিন শুধু ছবিতে দেখা যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন