প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উঠোনের এক কোণে বসে ছিলেন আলেয়া বেগম (৬৫), চালের খুদ কুড়োচ্ছিলেন। হঠাৎ তার হাত থেমে যায়। তিনি চোখ ছোট করে সামনে তাকান এবং মৃদু হেসে বলেন, "এখন সব পরিষ্কার দেখি।" কয়েক মাস আগেও তার পৃথিবী ছিল ঝাপসা, রান্নাঘরের আগুন, উঠোনের পথ, এমনকি নাতি-নাতনিদের মুখও ঠিকমতো চিনতে পারতেন না তিনি।
সেই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার গল্পের পেছনে আছেন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার এক নীরব মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খান।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বর্তমানে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। খায়রুল বাসার মালেকা চক্ষু হাসপাতাল থেকে ছানি ও নেত্রনালী অপারেশনের ব্যবস্থা করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসারের ভাষ্য, "সঠিক হিসেব নেই তবে ৪শতাধিক হবে।" দশক পেরিয়ে গেছে, প্রায়ই তো এ ধরনের সমস্যা নিয়ে দরিদ্র মানুষ আসে বাড়ীতে।
শুরুটা যেভাবে হয়েছিল:
মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার বলেন, "আমার স্ত্রীর চোখের নেত্রনালীর সমস্যার কারণে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে মালেকা চক্ষু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখি, যা আমার জীবনটাই বদলে দেয়।" তিনি বলেন, "দুইজন দরিদ্র মানুষ অপারেশনের খরচ জোগাড় করতে না পেরে কান্না করছিলেন। তাদের সেই অসহায় কান্না আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।"
তিনি আরও বলেন, "তখনই মনে হয়েছিল আমি কি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি না? শুধু ওই দুজন নয়, এমন শত শত মানুষ আছে, যারা টাকার অভাবে এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পারছে না।" সেই ভাবনা থেকেই তিনি ছানি-নেত্রনালী অপারেশনে সহযোগিতা শুরু করেন।
এই উদ্যোগে তার পরিবারের সদস্যরাও তার শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। খায়রুল বাসার জানালেন, "এই কাজের সিংহভাগ অর্থ জোগান দেয় আমার মেয়ের জামাই শামিম আহমেদ, সে চাকরি করে।" তিনি জানান যে, "আমার ছেলেও যথেষ্ট সহযোগিতা করে। তাদের সহায়তা না থাকলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না।"
মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খান এর বাড়ি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার খোর্দ্দমেগচামী গ্রামে। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। স্ত্রীসহ তিনি গ্রামের বাড়ীতেই থাকেন। আনসার ও ভিডিপি থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি কৃষি কাজে যুক্ত হয়েছেন। প্রতিবন্ধী সেবার জন্য তিনি রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছিলেন।
খায়রুল বাসার জানান, "সাধারণভাবে একজন রোগীর ছানি অপারেশনে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় মালেকা চক্ষু হাসপাতাল তার কাছ থেকে প্রতি রোগীর জন্য মাত্র ৪ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণ করে।" হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি বুঝে তাদের সহযোগিতা করছে বলেই তারা আরও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছেন।
বালিয়াকান্দির আলেয়া বেগম জানান, "চোখের সমস্যা শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবন থমকে যায়।" রান্না করতে গিয়ে বারবার ভুল হতো এবং হাঁটাচলাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। অপারেশন করানোর মতো টাকা ছিল না। পরে এক পরিচিতজনের মাধ্যমে তিনি বাসারের কাছে যান এবং তিনিই সব ব্যবস্থা করে দেন।
একই অভিজ্ঞতা কালুখালীর আব্দুল খালেক (৫৮) এর। দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন এবং চোখে ঠিকমতো দেখতেন না ফলে কাজও ঠিকঠাক করতে পারতেন না। কিন্তু এখন আবার মাঠে কাজ করতে পারছি, বলেন তিনি।
খায়রুল বাসার খান বলেন, "নিজের সামর্থ্যের মধ্যেই আমি এই মানবিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং পরিবারের সহায়তাই আমার প্রধান ভরসা।" তার ভাষায়, "টাকা দিলে একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কারও চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারলে সেটাই আমার সারাজীবনের সম্পদ হয়ে থাকে।" তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রাম-গ্রামান্তরে গিয়ে দৃষ্টিহীন হয়ে পড়া মানুষের খোঁজ নেন এবং তাদের অপারেশনের ব্যবস্থা করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের কথা না ভেবে অন্যের জন্য কাজ করাই এখন তার জীবনের মূল লক্ষ্য। পরিবারও তার এই কাজে পাশে আছে। স্ত্রীসহ সবাই তার মানবিক উদ্যোগকে সমর্থন করেন। গ্রামে দরিদ্র মানুষের কাছে চোখের ছানি একটি বড় সমস্যা। অর্থের অভাবে অনেকেই চিকিৎসা করাতে পারেন না, ফলে ধীরে ধীরে তারা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এমন বাস্তবতায় খায়রুল বাসারের এই উদ্যোগ তাদের জীবনে নতুন করে আলো ফিরিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আকরাম হোসেন বলেন, "খায়রুল বাসার খান এলাকায় এক অত্যন্ত সম্মানিত ও নির্ভরতার নাম।" দরিদ্র মানুষের কাছে তিনি যেন আশ্রয়ের ঠিকানা। তিনি যে কোনো ছানি রোগীর কথা জানতে পারলেই নিজেই তার বাড়িতে ছুটে যান। রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, অপারেশনের সব ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তিনিই পাশে থাকেন। শুধু নিজ এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত মানুষ তার সহায়তায় ফিরে পেয়েছেন দৃষ্টিশক্তি এবং জীবনের আলো।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন