প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সকাল থেকে দুপুর, দুপুরের পর বিকেল, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দৃশ্যপটও পাল্টায়। সকালের কোমল রশ্মিতে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ে পথের ওপর। শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত পায়ে ক্লাসের দিকে ছুটে যায়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গল্পে মেতে ওঠে, আবার কেউ প্রিয়জন বা ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সময় কাটায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়ক প্যারিস রোড। কাজলা গেট থেকে শেরে বাংলা ফজলুল হল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তা। যদিও দৈর্ঘ্যে এটি খুব বেশি নয়, তবে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য এটি স্মৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, জীবন-মৃত্যু, হাসি-কান্না এবং একাকিত্বের নানা অভিজ্ঞতার সাক্ষী এই প্যারিস রোড।
এখানে সবুজের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, ছায়াঘেরা পথ এবং তরুণদের উচ্ছ্বাস। দুই পাশে সারি সারি গাছ, প্রশস্ত পথ, নির্মল পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে প্রতিদিনই যেন নতুন রূপে ধরা দেয় এই সড়ক। এই পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছায় না, বরং অসংখ্য স্মৃতি ও গল্প তৈরি করে।
বিকেল নামলেই প্যারিস রোড যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, বন্ধুদের হাসি-ঠাট্টা, ছবি তোলা কিংবা নিছক হাঁটাহাঁটি চারপাশকে মুখরিত করে তোলে। কেউ এখানে মনের কথা বলতে আসে, কেউ ক্লান্তি দূর করতে। আবার কারও কাছে এই পথ একান্তই নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর জায়গা।
বর্ষার বৃষ্টিতে প্যারিস নতুন আবহ পায়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দে মেতে ওঠে, আবার কেউ দাঁড়িয়ে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করে। কখনো হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টিতে পথচারীদের ছোটাছুটি, আবার কখনো ইচ্ছা করেই বৃষ্টিতে ভিজে চলা—সব মিলিয়ে বর্ষায় প্যারিস রোড শিক্ষার্থীদের বৃষ্টিবিলাসের অন্যতম ঠিকানা হয়ে ওঠে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় প্যারিস রোড প্রতিদিন সরব থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা অনেকের কাছে এটি ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ। অতিথিরা এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, তেমনি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি স্মৃতি জমিয়ে রাখার একটি বিশেষ স্থান।
প্যারিস রোডের সৌন্দর্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে এর সবুজ আবহ। ঋতু বদলের সঙ্গে গাছপালার রং ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যও পরিবর্তিত হয়। বর্ষায় ভেজা পাতার সবুজ, শরতে নির্মল আকাশ, শীতে কুয়াশার আবরণ কিংবা বসন্তে ফুলের রঙ—প্রতিটি ঋতুতেই প্যারিস রোড যেন নতুন কোনো গল্প নিয়ে হাজির হয়।
ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এই পথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি। প্রথমবার বন্ধুর সঙ্গে হাঁটা, ক্লাস শেষে দীর্ঘ আড্ডা, বিশেষ দিনের ছবি কিংবা নিছক বিকেলের হাঁটাহাঁটি—এসব মুহূর্ত সময়ের সঙ্গে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ হলেও প্যারিস রোডের কথা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন, "প্যারিস রোডে হাঁটলে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততার মাঝেও একটু নিজের মতো করে সময় কাটানো যায়। বন্ধুদের সঙ্গে এখানে কাটানো সময়গুলো পরে হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে।"
রাজশাহীর রাজপাড়া থেকে ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, "প্যারিস রোড শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বাইরের দর্শনার্থীদের জন্যও আকর্ষণীয় একটি জায়গা। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে গাছপালা আর ভেজা রাস্তার দৃশ্যটা অসাধারণ লাগে। এখানে কিছু সময় কাটালে শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার অনুভূতি পাওয়া যায়।"
দিন শেষে যখন ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে আসে, তখনও প্যারিস রোড তার নিজস্ব সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে থাকে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলো, পথের ওপর দীর্ঘ ছায়া এবং নীরবতার মধ্যে হেঁটে যাওয়া কয়েকজন মানুষ—সব মিলিয়ে তখন তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ।
এত বিশেষত্ব থাকলেও প্যারিস রোডের জন্মের ইতিহাস কিন্তু অনেকটা সাদামাটা। ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে গগন শিরীষ গাছ লাগানো হয়। তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এ গাছগুলো রোপণের দায়িত্ব দেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী মোহাম্মাদ ইউনুসকে। তার হাত ধরেই লাগানো হয় গাছগুলো। তখন এটি ছিল নেহাৎ বৃক্ষরোপণের একটি উদ্যোগ।
জনশ্রুতি আছে, একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের কিছু ছবি তুলে তার এক বন্ধুর কাছে পাঠায়। বন্ধু দেখে বিস্মিত হয়ে বলে এটি কোন দেশের ছবি। সেই শিক্ষার্থী তখন বলে দেয় এটা আমাদের ক্যাম্পাসের। তার মধ্যে অন্যতম ছিল প্যারিস রোডের ছবিটিও। এরকম আরও অনেক গল্প রয়েছে।
এছাড়াও জনশ্রুতি আছে ১৯৮০-র দশকে ‘রোড টু সোয়াদ’ কিংবা ‘রোড টু প্যারিস’ নামের চলচ্চিত্রগুলোতে যে রাস্তা দেখানো হয়, সেসব রাস্তার সঙ্গে এই রাস্তাটির মিল থাকায় এর নাম হয় প্যারিস রোড।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে প্যারিস শুধু একটি রাস্তা নয়। এটি ক্যাম্পাস জীবনের এক নীরব সাক্ষী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এর ওপর দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কারও কাছে এটি বন্ধুত্বের স্মৃতি, কারও কাছে ভালো লাগার জায়গা, আবার কারও কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিকেলগুলোর ঠিকানা।
সময় এগিয়ে যায়, শিক্ষার্থীরা আসে-যায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু প্যারিস রোড থেকে যায় একইভাবে নতুন মানুষকে স্বাগত জানিয়ে, নতুন গল্পের অপেক্ষায়। হয়তো এ কারণেই রাবির প্যারিস রোড শুধু একটি পথ নয়; এটি এমন এক ক্যানভাস, যেখানে প্রতিদিনই লেখা হয় নতুন নতুন গল্প।
লেখক : ইসমাইল হোসেন সায়েম
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন