প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মু্হূর্তটি প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর থেকে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিএমবিসি) নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই করিডোর চীন, মিয়ানমান ও বাংলাদেশের মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশকে এর অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে এর চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়ার আগে।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’-এর প্রস্তাবটি নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ওই সফরের সময় ঢাকা ও নিজেদের তৃতীয় যৌথ ইশতেহার জারি করে বেইজিং। আলোচনা থেকেই উঠে আসে মূল বিষয়টি, এই অর্থনৈতিক করিডোর। প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনা হলো— সড়ক ও রেলযোগাযোগের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর সংযোগ স্থাপন।
চীনের জন্য এই করিডোর অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। কারণ এর মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালীর ওপর কৌশলগতভাবে নির্ভরশীলতা কমাতে এবং সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর একটি সংক্ষিপ্ত পথ দিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও এই করিডোরের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বর্ধিত বিনিয়োগ, বাণিজ্যের প্রসার এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে।
কিন্তু এই উদ্যোগটি একেবারেই নতুন নয়। ১৯৯৯ সালে প্রস্তাবিত 'বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার' (বিসিআইএম) করিডোরের পরিবর্তিত রূপ এটি। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এবং অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত এই প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। ফলে ভারতকে ছাড়াই এখন মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে নিয়ে এই করিডোর এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোরের প্রস্তাব বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ এনেছে। আবার একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশকে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলার কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চীন এই প্রকল্প এগিয়ে নিতে বেশ তৎপর। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, চীনা কর্মকর্তারা এই করিডোরের একটি কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) তৈরি করছেন। সেইসঙ্গে, মিয়ানমারে নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় দেশটির বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বেইজিং।
বাণিজ্য ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে দেখা যায়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ জোরালো হলেও দুই দেশের বাণিজ্য চিত্র মারাত্মকভাবে ভারসাম্যহীন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রায় ২২.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। অপরদিকে, চীনে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার। ফলে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারবে না। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব শিল্প সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি পণ্য বাড়াতে না পারে, তাহলে এই করিডোর ব্যবহার করে বাংলাদেশ উল্টো আরও বেশি চীনা পণ্যের বাজারে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যোগাযোগ অবকাঠামো অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অংশ মাত্র। বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি করেছে। তবে পণ্য পরিবহন, লজিস্টিকস সাপোর্ট, গুদামজাতকরণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থার (মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট) মতো খাতগুলোয় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতাগুলো অবিলম্বে দূর করা না গেলে, বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন বা বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার বদলে কেবল একটি ‘ট্রানজিট রুট’ বা পারাপারের পথ হিসাবেই রয়ে যাবে।
আর্থিক সংশ্লেষের বিষয়টিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বিপুল বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়া জরুরী। অর্থনীতিবিদদের মতে, যেকোনো বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বন্দর আধুনিকীকরণ, রফতানি অবকাঠামো, জলবায়ু সহনশীলতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিল্প উন্নয়নের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোকে আগে বিবেচনার মধ্যে আনা উচিত।
প্রস্তাবিত এই করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এই করিডোরের প্রস্তাবিত রুটটি মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। সেখানে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। বর্তমানে করিডোরের প্রস্তাবিত অঞ্চলের একটি বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে বা প্রভাবে রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য একটি বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
অতিরিক্তভাবে, রোহিঙ্গা সংকটও যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক যোগাযোগের যেকোনো উদ্যোগে যেন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াটি যেকোনোভাবে বাধাগ্রস্ত বা উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে অবকাঠামো তৈরি হলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য আয়ের নতুন উৎস তৈরি হতে পারে, যা তাদের পরোক্ষভাবে আরও শক্তিশালী করবে। তাই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি ব্যাপকভিত্তিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন আবশ্যক।
ভূরাজনীতির সমীকরণের দিক থেকে, এই করিডোরের সঙ্গে জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সংবেদনশীল সীমান্ত এবং কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’-এর কাছাকাছি চীনের এই উপস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন। এর সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি ঢাকাকে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকদের পরামর্শ হলো, বাংলাদেশের উচিত কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে কেবল নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তির ওপর এই প্রস্তাবের লাভ-ক্ষতির বিচার করা। লাওস-চীন রেলওয়ে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপেক) অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো প্রকল্পগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। এসব উদাহরণ দেখায় যে, কেবল অবকাঠামো তৈরি করলেই অর্থনৈতিক সাফল্য আসে না। অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য স্বচ্ছ অর্থায়ন, নিখুঁত সম্ভাব্যতা যাচাই, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি থাকা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ কী হতে পারে? বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের উচিত একবারে বড় ঝুঁকিতে না গিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া। আপাতত ছোট ও বাস্তবসম্মত যোগাযোগ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের প্রস্তাবিত এই করিডোরটিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে রাখতে হবে। একই সঙ্গে কেবল আমদানির ওপর নির্ভর না করে, বাংলাদেশে রফতানিমুখী চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া, ঋণ স্থায়িত্ব (ডেট সাসটেইনেবিলিটি), পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমের মান এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা থাকা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো যোগাযোগ প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই করিডোর আঞ্চলিক যোগাযোগে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সম্ভাবনা বেড়ে গেলে যে বিষয়টির ওপর মূলত হয়তো নির্ভর করবে, তা হলো বাংলাদেশ নিজের অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক এবং স্থিতিস্থাপক করে গড়ে তুলতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন