০১:৪৯ পি.এম
উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে গাজার মধ্যাঞ্চলে অস্থায়ী আশ্রয়ের বিপরীত পাশের একটি বাড়িতে বোমা হামলা হয়। সেই সময় ১৮ বছর বয়সী সাবা রাবাহ এবং তাঁর পরিবার সমস্তকিছু ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
যুদ্ধের মধ্যে এটি ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ দুর্ভোগ। এর আগে যুদ্ধে তিনি তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে তাঁদের পারিবারিক বাড়ি। পুরো পরিবারকে বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।
কিন্তু সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সাবা রাবাহ ফিলিস্তিনের জাতীয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ‘তাওজিহি’র বিজ্ঞান বিভাগের সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছেন।
আরও পড়ুন: এনসিপির আহ্বায়ক হলেন নাহিদ, সদস্যসচিব আখতার
ফিলিস্তিনি অঞ্চলের মাগাজি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় এবারই প্রথম এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গাজার মধ্যাঞ্চলীয় আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে সমাবর্তনের পোশাক পরে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছি। বিজ্ঞান বিভাগে সারা দেশে প্রথম হয়েছি।’
গত জুনে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গাজা, ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসর এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী বসবাসকারী আরও কয়েকটি দেশে একযোগে তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার অধিকাংশ স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিমান হামলা এবং গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কয়েক হাজার শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: চূড়ান্ত ভোটের আগে ব্রাজিলে টেলিভিশন বিতর্কে লুলা ও বলসোনারো মুখোমুখি
বাড়িঘর ও পুরো পাড়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর টিকে থাকা অনেক স্কুল ভবনই কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এ বছর প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ছিল ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন সাবা রাবাহ।
তিনি এই সাফল্যকে প্রয়াত বাবা ফায়েদ রাবাহ, মা, ভাইবোন এবং শিক্ষকদের উৎসর্গ করেছেন।
ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে ভেসে যায় তাঁদের পরিবার।
আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতি নয়, ইউক্রেনের সঙ্গে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি রাশিয়া: পুতিন
ঢোলের তালে নেচেছেন তরুণরা। প্রতিবেশীরা করতালি এবং উল্লাসে ফেটে পড়েন।
সাবা স্বজনদের আলিঙ্গন করেন, ছবি তোলেন এবং ফুলের তোড়া গ্রহণ করেন। দেয়ালে ঝুলছিল তাঁর প্রয়াত বাবার প্রতিকৃতি, যা উৎসবের মাঝেও হারানোর বেদনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
দুই বছরের যুদ্ধের মধ্য দিয়েই তিনি এই সাফল্যের পথ তৈরি করেছেন। সাবা বলেন, ‘আমার বাবা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ-এর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।’
তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুনে ইসরাইলি বিমান হামলায় তাঁর বাবা নিহত হন। তবে বাবার মৃত্যুর আগেই আল-মাগাজি শিবিরে ইসরাইলি বাহিনী প্রবেশ করলে তাঁদের পরিবার দুই দফা বাস্তুচ্যুত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁদের বাড়িও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: জাপানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, সুদের হার বাড়ানোর পথ তৈরি হচ্ছে
সাবা বলেন, ‘আমরা এতবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি যে, সঠিক সংখ্যা এখন আর মনে নেই।’
তিনি জানান, ‘এত বাস্তুচ্যুতি আর ভয় ছিল। আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার অর্ধেক বই হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি কখনও আমার লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি।’
পরীক্ষা চলাকালীন বিপদ একেবারে কাছেই ছিল। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার কয়েক দিন আগে আমাদের বাড়ির বিপরীত পাশের বাড়িতে বোমা হামলা হয়। এরপর আমরা আমাদের আশ্রয়ও হারাই।’
বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা পড়াশোনাকে আরও কঠিন করে তোলে। কখনও কখনও তাঁকে ব্যক্তিগত কোচিং করতে এবং পরীক্ষায় অংশ নিতে অন্যান্য এলাকায় যেতে হয়েছে। তিনি জানান, ‘পথে কী ঘটতে পারে, তা না জেনেই যেতে হয়েছে।’
আরও পড়ুন: জাতীয় নাগরিক পার্টির ১৯৫ সদস্যের পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা
সাবা বলেছেন, ‘আমার স্বপ্ন মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। এ স্বপ্ন আমার বাবারও ছিল।’
তিনি আরো জানিয়েছেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আশা, আমার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলবে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার জন্য আমি পূর্ণ বৃত্তি পাব।’
তাঁর ৫২ বছর বয়সী মা ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ জানিয়েছেন, দীর্ঘ শোক আর কষ্টের পর তাঁদের পরিবারে আবার আনন্দ ফিরে এসেছে।
তিনি স্মরণ করেন, তাঁর মেয়ে অনেক সময় মোবাইল ফোনের টর্চের আলোয় পড়াশোনা করেছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ জরুরি: প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন