প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বুড়ো আঙুল, তর্জনী এবং মধ্যমা—এই তিন আঙুলে দুই কাঠি বাজানোর সময় আঙুলগুলো প্রজাপতির ডানার মতো নড়তে থাকে। পূজার বাদ্য হিসেবে পরিচিত এই ঢাক বাজানোর প্রথা শত শত বছর ধরে একই ধারায় বজায় রয়েছে।
বাদ্যকরদের জন্য ঢাক অন্যতম প্রধান উপাদান। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ঢোল, কাঁসি, করতাল, মন্দিরা, খঞ্জনি, সানাই, বাঁশি এবং ঝনঝনি।
দুর্গাপূজার সপ্তাহব্যাপী আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হলো বাদ্যযন্ত্রের দল। পূজা মৌসুমে বাদ্যকররা তাদের বাড়ি ছেড়ে মণ্ডপে ছুটে আসেন। ফলে মণ্ডপগুলো উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মণ্ডপও এর ব্যতিক্রম নয়।
দিনভর সেখানে কেউ ঢাক-ঢোল, বাঁশি, কাঁসি, ঝুনঝুনি (ঝুমুর) বাজাচ্ছেন। ছন্দ একই থাকলেও লয় পরিবর্তিত হয়—কখনো দ্রুত, কখনো মধ্য এবং কখনো আবার ধীর লয়ে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে বাজানোর জন্য বাদ্যকররা কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। উপজেলায় এ বছর অন্তত ৪৬টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে বাজানোর জন্য ৭০ থেকে ৮০ জনের বেশি ঢাকি প্রয়োজন।
সন্ধ্যায় উপজেলার উজানচর মণ্ডপে ধূপের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে একদল ভক্ত দেবী দুর্গা ও তার পরিবার—গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং মহিষাসুর-এর বেদির সামনে নৃত্য করছিলেন। সন্ধ্যার এই নৃত্যকে বলা হয় আরতি। সেখানে ঢাক বাজাচ্ছিলেন সমীর দাস।
ঢাকি সমীরের বক্তব্য, ‘ঢাকের এই ছন্দের মধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে, যা প্রত্যেক বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, এটা রক্তে ঢেউ তোলে।’
আরেক বাদ্যকর স্বপন দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, পূজার এই ছন্দ ছয়-আট মাত্রার চক্রে বাজানো হয়, যা ঝুমুর তালের মতো। তিনি বলেন, ‘এটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কারণ ঝুমুর তাল হলো বিশ্বের সব ধরনের লোক সংগীতের অন্তর্নিহিত মৌলিক ছন্দ। এটা এমন এক ছন্দ-কাঠামো, যার সঙ্গে গোটা বিশ্ব আত্মিকভাবে যোগাযোগ করতে পারে।’
সোমবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাঞ্ছারামপুরের জমিদার বাড়ির পূজামণ্ডপে বাজাচ্ছিল চার ঢাকির একটি দল। এই দলটি নরসিংদির মনোহরদী উপজেলার একটি গ্রাম থেকে এসেছে। ছোট দলটি বাজাচ্ছিল দুটি ঢাক, একটি ঢোল এবং একটি কাঁসর ঘণ্টা নিয়ে।
দলটির নেতা আশিষ কুমার বলেন, ‘ঢাক আর ঢোলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। ঢাক আকারে বড় এবং এটি শুধুমাত্র এক পাশে বাজানো হয়। ঢোল বাজানো হয় দুই পাশে। ঢাকের বোলই প্রধান ভূমিকা পালন করে; ঢোল ও কাঁসরের বোল কেবল ঢাকের সঙ্গে সংগত করে।’
আশিষ আরও বলেন, ‘দেবী দুর্গা ও কালীর পূজার সঙ্গে এটি চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়; দুজনই শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক।’
কিশোর কমল দাসের হাতে ছিল ঝুনঝুনি। তার বক্তব্য, ‘আমি এটা সিজন্যাল (মৌসুম) করি। পূজো শেষে সেলুনে নাপিতের কাজে ফিরে যাব।’
উজানচরের ঢাকির দলটিকে ভাড়া করা হয়েছে ৬৫ হাজার টাকায়। ‘এই চুক্তিতে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা দুটোতেই বাজন অন্তর্ভুক্ত। দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর কালীপূজা।’
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রতন কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর একই দল ভাড়া করি না। বাজনার মান দেখে তাদের নিয়োগ দিই।’
উপজেলার সাহা পাড়ার মন্দিরের মণ্ডপে ঢাকির আরেকটি দল শুধুমাত্র দুর্গাপূজায় বাজানোর জন্য ৪৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। দলের বাদ্যকর রমেশ বিশ্বাস বলেন, ‘পূজা ব্যস্ততম মৌসুম, যা আমাদের বছরের ৯ মাস ব্যস্ত রাখে। বিয়ে, জন্মদিন, খতনা, এমনকি রাজনৈতিক সমাবেশের মতো অনুষ্ঠানে আমাদের ভাড়া করা হয়। এলাকায় এদল ব্যান্ড পার্টি নামে পরিচিত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন