প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার হামলা, ড্রোনের গতিবিধি এবং সামরিক অভিযানের বিপুল পরিমাণ ডেটা এখন যুক্তরাজ্যের কাজে লাগবে। এই বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে দেশটির সামরিক ঘাঁটি, রেলপথ, বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
এই উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্য একটি নজিরবিহীন চুক্তি করেছে কিয়েভভিত্তিক ‘অ্যাভেঞ্জার্স এআই ল্যাব’-এর সঙ্গে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের চুক্তি যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো হচ্ছে। চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের রণাঙ্গন থেকে অ্যাভেঞ্জার্স এআই ল্যাবের সংগ্রহ করা বিপুল ডেটা ব্যবহার করার সুযোগ পাবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত এআই কোম্পানিগুলো। এই তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হবে।
প্রথম ধাপে যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক ঘাঁটিতে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মাটির নিচে থাকা ফাইবার-অপটিক কেবলের সঙ্গে এআই-নিয়ন্ত্রিত সেন্সর যুক্ত করা। এই সেন্সরের মাধ্যমে আশপাশে মানুষের চলাচল, যানবাহনের গতিবিধি অথবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক নড়াচড়া শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। পরীক্ষার সফলতার পর বিমানবন্দর, কারাগার, গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ এবং জ্বালানি স্থাপনাসহ আরও বিস্তৃত এলাকায় প্রযুক্তিটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ব্রিটিশ সরকারের।
যে ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে ব্রিটেন
ব্রিটেনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠার পর এই উদ্যোগে গতি এসেছে। গত জুনে নিষিদ্ধ সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর কয়েকজন সদস্য স্কুটারে করে যুক্তরাজ্যের একটি সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন। তারা আরএএফ ব্রিজ নর্টনে ঢুকে দুটি সামরিক বিমানে স্প্রে পেইন্ট করে নিরাপদে বেরিয়ে যান। এই ঘটনা ব্রিটিশ নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে। পরে সংগঠনটি দাবি করে, তাদের এই অভিযানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো সম্ভব হয়েছে। এ ধরনের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের জন্য সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা তৈরির দিকে নজর দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
তিনটি ব্রিটিশ কোম্পানির হাতে যাচ্ছে যুদ্ধের ডেটা। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের তিনটি এআই প্রতিষ্ঠান সিনটেলা, মাইন্ড ফাউন্ড্রি এবং স্কাইরাল-নিরাপদ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই ডেটা ব্যবহারের নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ব্রিস্টলভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনটেলা ফাইবার-অপটিক সেন্সর প্রযুক্তিতে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে নজরদারি ব্যবস্থা তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তি করেছে। ইউক্রেনের রণাঙ্গনের তথ্য ব্যবহারের ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ড্রোন পরিচালনার ডেটা, সামরিক হামলার ভিডিও ফুটেজ এবং ফ্লাইট প্রোফাইলের মতো বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের এআই ব্যবস্থা উন্নত করার সুযোগ পাবে। এই বিশাল ডেটাসেটে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলা এবং সেগুলো ধ্বংসের প্রচেষ্টার তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চার বছরের যুদ্ধের ডেটা বিশেষভাবে মূল্যবান মনে করা হচ্ছে। কারণ এতে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হামলা, ড্রোনের ব্যবহার, সামরিক গতিবিধি এবং অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের বিস্তারিত চিত্র রয়েছে। এতদিন এ ধরনের এআই ব্যবস্থা তৈরিতে মূলত ইন্টারনেটে পাওয়া উন্মুক্ত তথ্য বা ওপেন সোর্স ডেটার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এবার সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া তথ্য যুক্ত হওয়ায় নতুন মডেলগুলো আরও কার্যকর হতে পারে বলে আশা করছে ব্রিটেন। ব্রিটিশ সরকারের লক্ষ্য শুধু হামলার পর তা শনাক্ত করা নয়। বরং কোনো সামরিক ঘাঁটি, রেললাইন বা বিদ্যুৎ গ্রিড কখন এবং কীভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে, সেটি আগেই অনুমান করতে সক্ষম এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে ভূগর্ভস্থ ফাইবার-অপটিক কেবল বসিয়ে সেখানকার মানুষের কিংবা যানবাহনের অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত করা হবে। এআই সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দিতে পারবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের দাবি, এই প্রযুক্তি শুধু বিদেশি রাষ্ট্রের হামলা ঠেকাতে নয়, সামরিক স্থাপনায় বিক্ষোভকারী বা আন্দোলনকারীদের অনুপ্রবেশ শনাক্ত করতেও ব্যবহার করা হবে।
এআই চিপেও নজর ব্রিটেনের
চুক্তিটি শুধুমাত্র নজরদারি প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে ড্রোন, রোবোটিকস এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত শক্তিশালী এআই চিপ তৈরির সুযোগও এর আওতায় রয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম বলেছেন, ব্রিটিশ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব এআই সক্ষমতার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা যুক্ত করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে এই উদ্যোগে। তার মতে, এর মাধ্যমে এমন প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সম্ভব হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অর্থনীতিকেও আরও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে।
তবে প্রশ্ন উঠছে কার্যকারিতা নিয়ে
যদিও উদ্যোগটিকে প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক স্টিভেন মার্ডক মনে করেন, ফাইবার-অপটিক কেবল ব্যবহার করে মানুষের চলাচল বা অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত করার প্রযুক্তি নতুন নয়; কয়েক দশক ধরেই এর ব্যবহার রয়েছে। তার প্রশ্ন, ইউক্রেন যুদ্ধের বিপুল ডেটা এই সেন্সরগুলোর সক্ষমতা বাস্তবে কতটা বাড়াতে পারবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তিনি এটাও মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন কিছু নতুন আচরণ বা লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে, যা আগে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত তথ্যের মধ্যে পাওয়া যায়নি। আর সেই জায়গাতেই ইউক্রেনের যুদ্ধের ডেটা ব্রিটেনের নতুন এআই নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য সূত্র-
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন