প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আশ্বিনের তীব্র রোদ, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা এবং নদীর তীরে কাশফুলের দোলায়িত দৃশ্য। এর সাথে বইঠার সুর, নৌকার গতিবিধি এবং দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওর উৎসবের রূপ ধারণ করে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ঘোড়াউত্রা নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দেখতে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে।
বিকেল ৫টায় নৌকাবাইচের কার্যক্রম শুরু হলেও সকাল থেকেই নদীর দুই পাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড় জমতে থাকে। নিকলীসহ কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা থেকে বহু মানুষ এ আয়োজন উপভোগ করতে আসেন। পাশাপাশি নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা থেকেও অনেকেই ছুটে আসেন। নদীর দুই পাড়ে এবং অসংখ্য নৌকায় বসে মানুষ নদীতে অবস্থান নেন। আয়োজকদের দাবি, দুপুরের পর দর্শনার্থীর সংখ্যা লাখেরও বেশি হয়ে যায়।
স্থানীয়দের মতে, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকাবাইচের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরনো। একসময় নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে হাওরাঞ্চলে উৎসবের আবহ তৈরি হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে গ্রামবাংলার বিভিন্ন লোকজ খেলা ও বিনোদনের মতো নৌকাবাইচও হারাতে বসেছে। নিকলীতে সর্বশেষ প্রায় এক যুগ আগে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবার এই আয়োজন করা হয়।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের উৎসাহে নিকলী সম্মিলিত নাগরিক সমাজ এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এতে মোট ১২টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার ছিল একটি মোটরসাইকেল, দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল একটি ফ্রিজ এবং তৃতীয় পুরস্কার ছিল এলইডি টেলিভিশন।
১২টি নৌকার মধ্যে প্রতিযোগিতার শেষে নিকলী সদর ইউনিয়নের মহরকোনা গ্রামের নৌকা প্রথম স্থান অর্জন করে। বিজয়ী দল মোটরসাইকেল, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল ফ্রিজ এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল এলইডি টেলিভিশন পুরস্কার হিসেবে পায়। পরে প্রধান অতিথি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বিজয়ী নৌকার মালিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিকলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হাজি মাসুক মিয়া, বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. মোকারম সর্দারসহ আরও অনেকে।
শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, ‘নৌকাবাইচ নিকলীসহ ভাটিবাংলার উৎসব। বিশেষ করে এটি হাওর অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। কালের বিবর্তনে এ উৎসব হারিয়ে যাচ্ছে। প্রায় এক যুগ পর ঘোড়াউত্রা নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
নিকলী সম্মিলিত নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার সভাপতি ও আয়োজক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মানিক মিয়া বলেন, ‘নৌকাবাইচ শুধু বিনোদন নয়, এটি গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসা জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা, কাবাডিসহ লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ খেলাধুলার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতেই এমন আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুব সমাজকে মাদক ও নানা অপরাধ থেকে দূরে রেখে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করাও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।’
নৌকাবাইচকে ঘিরে সকাল থেকেই ঘোড়াউত্রা নদীর দুই পাড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। নদীতে সারি সারি নৌকা এবং তীরে মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকা মিলনমেলায় পরিণত হয়। বইঠার সুর, দর্শনার্থীদের উল্লাস এবং প্রতিযোগী নৌকার গতিতে ফিরে আসে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের আবহ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন