প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধ্যায়। দীর্ঘ সামরিক শাসন, রাজনৈতিক বৈষম্য ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পক্ষে সুস্পষ্ট গণরায় দেয়। কিন্তু নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট দ্রুত গভীরতর হয়। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারের অন্যতম প্রধান দাবি। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে কেবল একটি সাধারণ নির্বাচন ছিল না; ছয় দফার পক্ষে এটি কার্যত একটি গণরায় হিসেবেও বিবেচিত হয়।
জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। সংরক্ষিত নারী আসনসহ জাতীয় পরিষদে দলটির আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৭টি, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট ছিল।
অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি—পিপিপি—সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে ৮৬টি আসন লাভ করে।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। ৩০০টি আসনের মধ্যে দলটি ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে।
নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে অনীহা দেখা দেয়।
পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো দাবি করেন, পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর দল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হওয়ায় কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব থাকতে হবে। এ অবস্থানকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও পিপিপির মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।
নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ১ মার্চ তিনি আকস্মিকভাবে অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও ক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে।
অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেন এবং জনগণকে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।
তাঁর ভাষণের অন্যতম আলোচিত বক্তব্য ছিল—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। একই সময়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্য, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পূর্ব পাকিস্তানে আনার কার্যক্রম চলতে থাকে।
আলোচনা চললেও সংকটের কোনো রাজনৈতিক সমাধান শেষ পর্যন্ত হয়নি। পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচালিত ওই অভিযানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
২৫ মার্চের রাত পেরিয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
১৯৭০ সালের নির্বাচন বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন ছিল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় প্রমাণ করে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ছিল।
নির্বাচনের গণরায় অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত এবং পরবর্তী সামরিক দমন-পীড়ন পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায় তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই গণরায় বাস্তবায়নে ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে এবং জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এই নিউজ কি নামে প্রকাশ করা যায়
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন