প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উত্তর মেরু অঞ্চল হয়ে ইউরোপে যাতায়াতকারী দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম কনটেইনারবাহী জাহাজ দেশে ফিরে এসেছে। মঙ্গলবার, বন্দরনগরী বুসানে জাহাজটির ক্যাপ্টেন ও কর্মীদের স্বাগত জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং। রবিবার, ৫০ দিনের যাত্রা শেষে দেশে ফেরে জাহাজটি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্যানস্টার অ্যাক্রো’ নামের জাহাজটি যাত্রাপথে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম ও পোল্যান্ডের গদানস্ক বন্দরে থামা ছিল। বিভিন্ন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাধা সত্ত্বেও, দক্ষিণ কোরিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে এই পথে নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু করার পরিকল্পনা করছে।
অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট লি উল্লেখ করেন, প্রচলিত সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে গেলে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উত্তর মেরু হয়ে নতুন এই সমুদ্রপথ চালু হলে সংকটের সময় পণ্য পরিবহনের জন্য একটি বিকল্প পাওয়া যাবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্র ও মৎস্যমন্ত্রী হোয়াং জং উ জানিয়েছেন, ২০২৭ সালে এই পথে আরও কয়েকটি পরীক্ষামূলক যাত্রা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কনটেইনারবাহী জাহাজ ও গাড়ি পরিবহনের জাহাজ অংশগ্রহণ করবে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই পথে নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু করতে চায়। মন্ত্রীর আশা, ২০৪০ সালের দিকে এই পথটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বছরের ছয় মাসের বেশি সময় এই পথে জাহাজ চলাচল সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে উত্তর মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের বরফ কমছে। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল আগের চেয়ে সহজ হয়ে উঠছে। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যাওয়ার তুলনায় উত্তর মেরুর এই পথে যাত্রার সময় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম পথ ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখবে বলে জানিয়েছেন হোয়াং।
উত্তর মেরু হয়ে প্রস্তাবিত সমুদ্রপথটি রাশিয়ার উপকূল ঘেঁষে গেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। তাই এই পথে জাহাজ চলাচল নিয়ে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন বলেন, রাশিয়া এখন পর্যন্ত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও রয়েছে।"
প্রেসিডেন্ট লি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা বজায় রেখেই এই সমুদ্রপথের উন্নয়ন করা হবে। তিনি এ নিয়ে অন্যান্য দেশগুলোর উদ্বেগ দূর করতে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এই পথে জাহাজ চলাচল লাভজনক হবে কি না, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির আইনপ্রণেতা কাং সেউং কিউর কার্যালয় এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সমুদ্র ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক যাত্রায় জাহাজটির লক্ষ্য ছিল ১ হাজার ৩০০ টিইইউ পণ্য পরিবহন করা। টিইইউ হলো ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কনটেইনারের সমপরিমাণ পণ্য পরিবহনের হিসাব।
কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর সময় জাহাজটিতে রপ্তানিপণ্য ছিল মাত্র ৭৩৭ টিইইউ। দেশে ফেরার সময় জাহাজটিতে ছিল ১ হাজার ৭৪৩ টিইইউ খালি কনটেইনার। ফেরার পথে কোনো আমদানি পণ্যও আনা হয়নি। প্রেসিডেন্ট লি বলেন, ইউরোপে পণ্য খালাস করার পর ফেরার পথে জাহাজে পণ্য তোলার ব্যবস্থা করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পথে নিয়মিত জাহাজ চলাচল লাভজনক করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা, বরফের মধ্যে জাহাজের গতি, বিশেষ বিমার বাড়তি খরচ এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়।
এসব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারলে উত্তর মেরু হয়ে নতুন এই সমুদ্রপথ দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যের আরেকটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। তবে পথটি বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন