প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) পরপর শিক্ষক এবং হলের ক্যান্টিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়ে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এসময় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন, যা সব ধরনের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) রাতে শিক্ষার্থীরা ৩ দফা দাবি তুলে ধরে এ কর্মসূচির ঘোষণা করেন। তারা দাবির আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন, এবং এ কারণে ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেন।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনছার, অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলাম এবং হলের ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যান্টিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে ৩ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
তবে আলোচনার পরও দাবিগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় পূর্বঘোষিত কর্মসূচির সঙ্গে একাডেমিক এবং প্রশাসনিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের ৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। তাদের প্রথম দাবি হল, হলের ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয় দাবি হল, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনসার এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামকে অতিদ্রুত স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে। তাদের তৃতীয় দাবি হলো, সম্প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন ২৪’ নামের ক্লাবটির নিবন্ধন বাতিল করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে সরাসরি কিছু সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং সময়ক্ষেপণও করেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, দাবিগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা কার্যকর পদক্ষেপের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
এর আগে, বুধবার (২৩ জুলাই) সকালে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। পরে তারা হাদি চত্বরে অবস্থান নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিকবার বৈঠকে বসেন। বৈঠকগুলোর উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নূরুন্নবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলসমূহের স্কুলের ডিন, রেজিস্ট্রার, ডিসিপ্লিন প্রধান, আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্ট, ছাত্রবিষয়ক পরিচালক এবং অন্যান্য বিভাগের পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় এ ঘটনার তদন্তে হল প্রশাসন ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশনা দেয়। একই সঙ্গে অভিযুক্তের পরিচালিত হল ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল, হলে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করা এবং দুই ছাত্রী হলের ক্যান্টিনে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়াও ছাত্রী হলের ক্যান্টিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পাওয়া সাপেক্ষে পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নুরুন্নবী জানান, অভিযুক্ত ইমাম হাসানকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর আদালতে হাজির করা হয়েছে। তিনি জানান, পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এসব ধারায় জামিনের সুযোগ নেই।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়’২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে ছাত্রীরা। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে হলজুড়ে আবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এর আগে, চলতি বছরের ১৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। বর্তমানে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের গঠিত ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগের তদন্ত করেছে।
এছাড়া, গত বছরের আগস্টে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে এক ছাত্রী অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি এবং অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল। এর কিছুদিন পর অন্য বিভাগের আরেক ছাত্রীও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন। অভিযোগ দুটি তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে গত ২৬ ডিসেম্বর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের তদন্ত কমিটি দুটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৪তম সিন্ডিকেট সভায় প্রতিবেদন দুটি গৃহীত হয়।
সিন্ডিকেট সভায় তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে অধ্যাপক ড. রুবেল আনছারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে অন্য অভিযোগের কারণে তাকে আগামী দুই বছরের জন্য বাংলা ডিসিপ্লিনে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সকল ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন