প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শুরু হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।
এবার আয়োজন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো নামি দেশগুলোতে।
এটি প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজনকৃত এই টুর্নামেন্ট বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করার প্রচেষ্টা করেছে।
তবে এই আসরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো রেকর্ডসংখ্যক ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণ, যা বৈশ্বিক ফুটবলের মানচিত্রে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফুটবল দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার আধিপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু গত দুই দশক ধরে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো ধাপে ধাপে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদেশি কোচিং স্টাফ, ইউরোপীয় লিগে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফলস্বরূপ, এই দেশগুলো এখন নিছক অংশগ্রহণকারী নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলো মরক্কো, সেনেগাল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর, সৌদি আরব, কাতার, ইরান, ইরাক, জর্ডান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা।
এই দেশগুলো আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হলেও তাদের মধ্যে একটি বড় মিল হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, যা অনেক ক্ষেত্রেই ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আফ্রিকান ও এশিয়ান মুসলিম দেশগুলোর এই সম্মিলিত উপস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ক্রীড়া অংশগ্রহণ নয়, বরং বৈশ্বিক ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন।
উত্তর আফ্রিকার মরক্কো, এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত দল।
এ দেশে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ মুসলিম।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তারা প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে বিশ্বের ফুটবল ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় রচনা করেছে।
তাদের সাফল্য কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল পরিকল্পনা, শক্তিশালী একাডেমি এবং ইউরোপে খেলা প্রবাসী খেলোয়ाड़দের সমন্বয়ের ফল।
আশরাফ হাকিমি, ইউসেফ এন-নেসিরি, সোফিয়ান আমরাবাত ও ব্রাহিম দিয়াজদের মতো তারকাপূর্ণ মরক্কো এখন বিশ্ব শিরোপার স্বপ্ন দেখছে।
অভিজ্ঞता ও সংগঠনের জন্য আফ্রিকার সবচেয়ে সংগঠিত ফুটবল কাঠামোর একটি হিসেবে তারা স্থানীয় ফুটবলের স্থায়ী শক্তি হয়ে উঠেছে।
সেনেগাল আফ্রিকার আরেক মহান শক্তি, যেখানে প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ মুসলিম।
২০০২ সালে অভিষেক বিশ্বকাপে তারা তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়, যা আজও আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম বড় বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, এডুয়ার্ড মেন্ডির মতো ইউরোপীয় লিগের খেলা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নিকট গঠিত সেনেগাল নিয়মিত আফ্রিকান প্রতিযোগিতায় শিরোপার জন্য লড়াই করে।
শৃঙ্খলা ও শারীরিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই দলটি যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলিম দেশ আলজেরিয়া এবার আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসেছে দীর্ঘ বিরতির পর।
২০১৪ বিশ্বকাপে তারা জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল।
রিয়াদ মাহরেজ, ইসমাইল বেনাসের ও ইউসেফ আত্তালদের নিয়ে গঠিত দলটি এবার আরও পরিণত।
আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলের এই দলটি আক্রমণাত্মক ফুটবল ও কৌশলগত শৃঙ্খলার জন্য সুপরিচিত।
তিউনিসিয়ার পুরো জনসংখ্যাই মুসলিম।
এরা ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে আফ্রিকার স্থিতিশীল দলগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিত।
২০২২ সালে তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল।
তিউনিসিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দলগত শৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষামূলক কৌশল।
যদিও তারা বড় তারকাপ্রবণ দল নয়, তবে সংগঠিত ফুটবল বিপরীত দিকে যেকোনো বড় দলকে সমস্যায় ফেলতে সক্ষম।
মিসরের জনসংখ্যার অধিকাংশই মুসলিম এবং এটি আফ্রিকার একটি ঐতিহ্যবাহী ফুটবল দল।
রেকর্ড সাতবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী মিসর এবার নতুন প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে।
মোহাম্মদ সালাহ তাদের সবচেয়ে বড় তারকা, এবং লিভারপুলের এই ফরওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে মিসরের আক্রমণভাগ তৈরি হয়েছে।
আফ্রিকার সবচেয়ে সফল ক্লাব ইতিহাসের সঙ্গে জাতীয় দলের এই সংমিশ্রণ তাদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
প্রায় ৯৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ সৌদি আরব, এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম।
১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের তিরিশ বছর পর, তারা নিয়মিত বিশ্বমঞ্চে অংশ নিচ্ছে।
২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা ফুটবল বিশ্বে একটি চমক সৃষ্টি করে।
সেই জয় আজও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে সৌদি আরব ঘরোয়া লিগে বিপুল বিনিয়োগ করছে, যেখানে বিশ্বসেরা তারকারা খেলছেন।
এই বিনিয়োগ জাতীয় দলের শক্তি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কাতারের জনগণের একটি বড় অংশ মুসলিম, যা প্রায় ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি।
২০২২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করে তারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
এবার তারা প্রথমবারের মতো স্বাভাবিক বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা পেয়েছে।
অ্যাসপায়ার অ্যাকাডেমির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কাতারের ফুটবল উন্নয়নের ভিত্তি।
আকরাম আফিফ ও আলমোয়েজ আলী মতো তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত দলটি এখন আরও পরিণত ও প্রতিযোগিতামূলক।
প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলিম, দেশ ইরান এশিয়ার সবচেয়ে অভিজ্ঞ দলগুলোর একটি।
এটি তাদের টানা বিশ্বকাপে উপস্থিতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
ইরানের ফুটবল সবসময়ই শৃঙ্খলা, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য পরিচিত।
মেহেদি তারেমি, আলিরেজা জাহানবখশ এবং এহসান হাজসাফির মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটি এবার আরও দূর যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে।
রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও তাদের ফুটবলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
প্রায় পুরোপুরি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইরাক, দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এসেছে।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেও ইরাকের ফুটবল টিকে আছে, যা তাদের প্রত্যাবর্তনকে আরও অর্থবহ করে।
২০০৭ সালের এশিয়ান কাপ জয়ী দলের উত্তরসূরিরা এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণের অপেক্ষায় আছে।
তাদের লক্ষ্য অন্তত গ্রুপ পর্বে কিছু ভালো অর্জন করা এবং বিশ্বকাপে প্রথম জয় অর্জন করা।
জর্ডানের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ মুসলিম।
এই দেশটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের এশিয়ান কাপের ফাইনালে পৌঁছে তারা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
মুসা আল-তামারির মতো ইউরোপীয় লিগে খেলা খেলোয়াড় জর্ডানের বৃহত্তম ভরসা।
সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামোর মধ্যেও তাদের এই অর্জন বিশ্ব ফুটবলে অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
মধ্য এশিয়ার প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম দেশ উজবেকিস্তান এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে।
এটি তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন।
দীর্ঘদিন কাছাকাছি গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর, তারা অবশেষে বিশ্বমঞ্চে জায়গা পেয়েছে।
এলদোর শোমুরোদভ ও আবদুকোদির খুসানভদের সহযোগিতায় গঠিত দলটি ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী এশিয়ান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গৃহীত হচ্ছে।
প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলিম দেশ তুরস্ক, ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এসেছে।
২০০২ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে তারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল।
হাকান চালহানওলু, আরদা গুলের ও কেনান ইয়িলদিজদের মতো প্রতিভাবান প্রজন্ম নিয়ে তুরস্ক এবার ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরতে চায়।
তাদের লক্ষ্য আগের সফলতার পুনরাবৃত্তি করা।
বলকান অঞ্চলের এই দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ মানুষ মুসলিম।
এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ।
সীমিত জনসংখ্যা ও সম্পদের সত্ত্বেও ইউরোপের কঠিন বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে তাদের এই উঠানো একটি বড় অর্জন।
দেশটির ফুটবল ইতিহাস রাজনৈতিক বাস্তবতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সুতরাং, তাদের প্রতিটি আন্তর্জাতিক সাফল্যই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী এই ১৩টি মুসলিম দেশের মধ্যে আফ্রিকা থেকে পাঁচটি, এশিয়া থেকে ছয়টি এবং ইউরোপ থেকে দুটি দেশ সেটিতে রয়েছে।
এই সকল দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা বহু ৭০০ মিলিয়নেরও বেশি মুসলিম জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপ বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তন আনয়ন করেছে।
ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রূপ নিচ্ছে,
যেখানে আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল, সেনেগালের ধারাবাহিক উত্থান, সৌদি আরবের আর্জেন্টিনা বধ, কাতারের সংগঠিত উন্নয়ন, ইরাক ও জর্ডানের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন এবং উজবেকিস্তানের অভিষেক এই বিশ্বকাপে মুসলিম বিশ্বের ফুটবল ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করছে।
এই আসর কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি পরিবর্তিত বিশ্ব ফুটবল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে নতুন শক্তিগুলো এখন শিরোপার লড়াইয়ে সক্রিয় অংশীদার।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন