প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নাম চায়না দুয়ারি। এটি একটি হালকা মিহি বুননের ছোট ফাঁসের জাল। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ আটকা পড়ে। মাছ ছাড়াও ধরা পড়ে মাছের পোনাসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ ও খাদ্যকণা। এই কারণে জালটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নড়াইলে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ জালটির বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনের অভিযানের পরও এই জালে মাছ শিকার অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরার সুবিধার কারণে জেলার মাছ শিকারিদের মধ্যে চায়না দুয়ারি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গোল লম্বা আকৃতির এই জালটি খাল, বিল, নদী-নালার স্রোতের মুখে রাখলেই জোয়ারের পানিতে আসা যে কোনো আকৃতির দেশীয় মাছ একবার জালে প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না। ফলে এই জালের ব্যবহারে দেশি মাছের পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ৬টা। নড়াইল সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের রুখালী এলাকার বিলের পানিতে পেতে রাখা চায়না দুয়ারির ফাঁদ তুলছেন এক মাছ শিকারি। অন্যান্যদের মতো তার জালেও ধরা পড়েছে দেশীয় মাছ এবং কাঁকড়াসহ নানা জলজ জীব। সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য মাছের পোনা।
বাজারে বিক্রির জন্য উপযোগী মাছ আলাদা করে বাকিগুলো পানিতে না ফেলে রাখা হচ্ছে খালপাড়ে। কিছু পোনা সেখানে ছটপট করতে করতে মারা যাচ্ছে।
তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গেছে, চায়না দুয়ারি জাল শুধু রুখালী বিলেই নয়; জেলার মাইজপাড়ার বিল, ইছামতী বিল, কলোড়ার বিল, পাটেশ্বরী বিল, দুধপাতলের বিলসহ তিন উপজেলার প্রত্যেক খাল-বিল, নদী-নালাসহ উন্মুক্ত জলাশয়ে এই ফাঁদ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দিন দিন খাল-বিলে দেশীয় মাছের সংখ্যা কমছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন মাছ শিকারি জানান, চায়না দুয়ারি ব্যবহার করে সাধারণ জালের তুলনায় কম সময়ে বেশি মাছ ধরা সম্ভব। একবার খাল-বিলে পেতে রাখলে স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা মাছ সহজেই ধরা পড়ে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা ও অভিযানের পরও তারা এই জাল ব্যবহার করতে থাকেন।
জেলেরা জানান, চায়না দুয়ারি ‘ম্যাজিক জাল’ নামেও পরিচিত। জালের সুতা সূক্ষ্ম এবং মিহি হওয়ায় অনেকের ধারণা, এই জালের সুতা চীন থেকে আমদানি করা হয়। তাই জালটির নামের সঙ্গে ‘চায়না’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। বিশেষ এই জালের দুই মাথা খোলা বলে একে ‘দুয়ারি’ বলা হয়। মান ও দৈর্ঘ্যভেদে এর আকার নির্ধারিত হয়।
সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। এর গিঁট বা ফাঁস এত ক্ষুদ্র যে পানি ছাড়া আর কিছু বের হতে পারে না।
জালের মধ্যে দেওয়ার জন্য লোহার চারকোনা রড দিয়ে অনেকগুলো ফ্রেম বসিয়ে এই জাল তৈরি করা হয়। এটি নদীর একেবারে তলদেশ পর্যন্ত যায় এবং তলদেশে মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। ফলে কোনো মাছ একবার জালে ঢুকলে আর বের হতে পারে না।
নড়াইল কালিয়া উপজেলার বাবলা হাচলা এলাকার এক জেলে জানান, দৈর্ঘ্য ও মানভেদে একটি চায়না দুয়ারির দাম স্থানীয় বাজারে চার হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এক রাতে এই জালে যে পরিমাণ মাছ ওঠে, তা অন্য কোনো জালে ওঠে না। সেজন্য পরিশ্রমও তেমন করতে হয় না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে জেলায় ২৪টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসময় আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ২৯ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। জরিমানা আদায় করা হয় ১৯ হাজার টাকা। নিষিদ্ধ এই জালের ব্যবহার বন্ধে অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, নড়াইল দেশীয় মাছের জন্য ঐতিহ্যবাহী। এখানে প্রচুর খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয় রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয়ে অবৈধ চায়না দুয়ারি দিয়ে ব্যাপকভাবে দেশীয় মাছ ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে সচেতন করতে। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালাতে পারছি না। জনবল সংকট আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকটও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদেরও এই নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এই মৎস্য কর্মকর্তা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন