প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অপরাধ না করেও মাদকের মামলায় ভিন্ন এক আয়নাবাজির শিকার হয়ে মৃত্যুদণ্ডের হুলিয়া নিয়ে ১ মাস ২১ দিন কারাগারে ছিলেন কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত নজির আহমদের ছেলে সোনা মিয়া।
বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর আদালত কর্তৃক দেয়া ৪টি শর্তের মধ্যে একটি সিদ্ধান্তের আলোকে শুক্রবার সকালে সাড়ে ১০টায় সোনা মিয়া কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন, এমনটি জানিয়েছেন জেলা সুপার মো. ওবায়াদুর রহমান।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সোনা মিয়া নিজের দ্বিতীয় জন্ম হয়েছ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব করা মহাপাপের। এই পাপ যেন কেউ না করেন।’
সোনা মিয়া জানান, ‘যে রোহিঙ্গা আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ইয়াবা মামলায় আসামি হয়েছে, তার সঙ্গে প্রায় ১০ বছর আগে আমার পরিচয় ছিল। কিন্তু সে আমার জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি কীভাবে পেয়েছে, তা আমি জানতাম না। র্যাব আমাকে গ্রেপ্তার করার পরও বুঝতে পারিনি, আমার বিরুদ্ধে কী মামলা রয়েছে। কারাগারে যাওয়ার পর বুঝতে পারি, আমি নাকি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আমি বারবার বলেছি-জীবনে কোনো মামলায় জড়াইনি, আমাকে তদন্ত করে দেখেন। পরে ছবি, আঙুলের ছাপ, শারীরিক গঠন ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রমাণ হয়, আমি ইয়াবা মামলার আসামি নই। প্রকৃত আসামি রমজান আমার পরিচয় ব্যবহার করেছে। আমি প্রায় দেড় মাস অন্যায়ভাবে কারাগারে ছিলাম। আমার জীবনের অনেকটা সময় ও সম্মান নষ্ট হয়েছে। আমি ক্ষতিপূরণ চাই। আর যে রমজান আমার পরিচয় ব্যবহার করে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আজ আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। এজন্য আইনজীবী, পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মী এবং জেলা সুপারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহর রহমত ও সবার সহযোগিতায় আমি বেঁচে গেছি বলেও জানান সোনা মিয়া।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ১ মার্চ। কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পুলিশের এক অভিযানে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যে মামলার এজাহারের ২ নম্বর আসামি হিসেবে নাম রয়েছে সোনা মিয়ার। সেখানে পিতার নাম লেখা হয় নজির আহমদ এবং বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া। অভিযানের সময় ওই ব্যক্তির কাছে পাওয়া জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির সূত্র ধরে সোনা মিয়ার নামটি ব্যবহারের কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালত থেকে প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তখনকার ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, ২ নম্বর আসামির নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করেছে। অনুসন্ধানে ‘সোনা মিয়া’র দেওয়া নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ওই মামলায় ‘সোনা মিয়াসহ’ ৫ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একজন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টমূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর নতুন প্রশ্ন উঠে। কারাগারে যাওয়ার ২/৩ দিন পর ‘সোনা মিয়া’ কারাগারের জেল সুপার বরাবর আবেদন করেন যে, তিনি এই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার বিষয়টি জেলা জজ, কক্সবাজারের কাছে পাঠিয়ে দেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নিদের্শ দেন। গত ২ জুলাই কক্সবাজার সদর থানার পুলিশ আদালতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করে।
এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০২০ সালে ইয়াবা সহ গ্রেপ্তার এবং জামিনপ্রাপ্ত সোনা মিয়া মামলার রায় ঘোষণার পর র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার সোনা মিয়া এক ব্যক্তি নন। ঘটনার প্রাথমিক সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম ছিল রমজান।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে গ্রেপ্তার থাকা ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার সময় গ্রেপ্তারের আসামিদের মধ্যে ২ নম্বর আসামির প্রকৃত নাম ছিল রমজান। তিনি নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ নামে পরিচয় দেন এবং পরে পুলিশকে একটি জন্মনিবন্ধন কার্ড দেখান। রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় একসঙ্গে দীর্ঘকাল একই ঘরে অবস্থান করেন। কোন কারণে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনটি রমজান তার কাছে রেখেছিল।
কারাগারের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর হাজতে থাকা ব্যক্তি এবং সাজা হওয়ার পর গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিচয়ে মিল রয়েছে ভিন্নতা। ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে সংরক্ষিত ছবি এবং ২৩ জুন গ্রেপ্তারের পর নেয়া ছবি ভিন্ন। সেইসাথে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পিতার নাম মৃত নজির আহমদ, মাতা সোনারা বেগম, স্ত্রী আয়েশা, দুই ছেলে দুই মেয়ে, ছেলে নাম মোহাম্মদ আলী, উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি, শ্যামলা এবং শনাক্ত করণের চিহ্ন হিসেবে বাম গালে ক্ষত, ডান গালে ক্ষম, ডান বাহুতে ক্ষত রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
২৩ জুন গ্রেপ্তার সোনা মিয়ার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মাতার নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস, এক ছেলে, তিন মেয়ে, ছেলে ওমর ফারুক ও মেয়ে নাহিদা লেখা রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি, শ্যামলা এবং শনাক্তকরনের চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বামে তিল, পিঠের মাঝে তিল রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশ প্রতিবেদনটি আদালতে আসলে ১২ আগস্ট সোনা মিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত দেন আদালত।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান জানান, কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে দেয়া ৪টি শর্ত হল, কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার আইডি কার্ড জমা প্রদান, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা প্রদান, কোনোভাবে দেশ ত্যাগ না করা, একই সাথে ৩ মাস পর পর আদালতে হাজির হওয়া।
একই সাথে এ ঘটনায় মুল আসামিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মামলাটি দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল সহ পুরো বিষয়ে তদন্তকারি কর্মকর্তার চরম গাফেলতি রয়েছে। কোনো এক ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন নিয়ে অন্য কেউ ওই নামে পরিচয় দিলে তা বের করার দায়িত্ব পুলিশের তদন্তকারি কর্মকর্তার। এই মামলার ক্ষেত্রে সোনা মিয়ার প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা যায়নি বলে অভিযোগপত্র দাখিল করে দায়হীনতা দেখিয়েছে। এমনকি ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম যে রমজান তাও বের করা হয়নি। নানা কৌশলে প্রকৃত আসামি জামিনে মুক্ত, পালাতক, পরে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়। কিন্তু সোনা মিয়াকে খোঁজার জন্য কারাগারে পাঠানো হয়। সোনা মিয়া মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনছেন। এর মধ্যে আবেদনের সংরক্ষিত ২০২০ সালের তথ্য এবং ২০২৬ সালের তথ্য মিলিয়ে দেখা গেল ভিন্নতা। আদালতের আদেশে সোনা মিয়ার নাম ব্যবহারকারী রমজান নামের ব্যক্তিকে আনা হলো প্রকাশ্যে।
আদালতের আদেশে প্রতিবেদন দাখিলের সত্যতা স্বীকার করেছেন কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী।
তিনি বলেন, পুলিশ দীর্ঘ তদন্তে সোনা মিয়া নাম ব্যবহার করে রমজান নামের এই ব্যক্তি আয়নাবাজির ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা উঠে এসেছে। আদালতের মুক্তির আদেশটি হাতে পেয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন