প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা শুক্রবার দেশের সম্পূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে এবং তিনটি কৌশলগত দ্বীপ দখল করেছে। এই আকস্মিক অভিযানের ফলে ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর তাদের কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে।
এএফপি সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানের কয়েক মাসের হরমুজ প্রণালী অবরোধের পর নতুন এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
শুক্রবার হুতিদের এই অগ্রযাত্রাকে ইরান স্বাগত জানিয়েছে।
এক সপ্তাহের অভিযানে শত শত মানুষের প্রাণহানির পর ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুথিরা লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাবের প্রণালীর ইয়েমেন অংশের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে নিয়েছে।
সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের একজন স্থানীয় কর্মকর্তা শুক্রবার বলেছেন, হুতিরা ‘বাব আল-মান্দাব এলাকা ও মায়্যুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিয়ে নিয়েছে।’
পরে সরকারের একজন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হুতিরা প্রণালীর আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ— গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দখল করেছে।
এইভাবে প্রণালীর ওই দুটি দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরের পুরো উপকূলীয় এলাকা দখল করেছে।
ওই সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘পশ্চিম উপকূলে আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকাই এখন তাদের দখলে চলে গেছে।’
এক প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে জানিয়েছেন, সশস্ত্র ব্যক্তিরা বাব আল-মান্দাবের উপকূলজুড়ে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা সামরিক যান নিয়ে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করছে।
বিশেষ করে প্রণালীর মাঝখানে অবস্থিত মায়্যুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে হুতিদের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
গত জুলাই থেকে তারা সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় লোহিত সাগরপথে তেল পরিবহনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের শুক্রবার হুতিদের এই ‘বিরাট বিজয়ের’ জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি এএফপিকে বলেছেন, ‘এখন ইরানিরা শুধু হরমুজ প্রণালীই নিয়ন্ত্রণ করছে না, তারা মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নৌপথও নিয়ন্ত্রণ করছে।’
এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।
এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সর্বশেষ অগ্রযাত্রার পর সৌদি আরব ছাড়া অন্য সবার জন্য বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল নিরাপদ।
উভয় পক্ষের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, হুতিদের এই অভিযানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত দেশটির দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের অংশ। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
হুতি সমর্থক আবদুলহামিদ দাইফাল্লাহ প্রণালী ও এর আশপাশে গোষ্ঠীটির ‘বড় বিজয়ের’ প্রশংসা করেছেন।
সানা শহরের এই বাসিন্দা বলেছেন, ‘তারা চার বছর ধরে এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।’
এদিকে দীর্ঘদিনের শত্রু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এ সপ্তাহে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এতে সৌদি আরবের কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায় এবং ৭৩ জন আহত হন।
কাপারনিকাস সেন্টিনেল ডেটার বৃহস্পতিবারের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, মদিনার কাছে কালো ধোঁয়া উড়ছে। ওই এলাকা দিয়ে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন লোহিত সাগর উপকূলের দিকে গেছে।
লোহিত সাগর উপকূলে নতুন অভিযান শুরুর আগেই ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বড় একটি এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সম্প্রতি তারা হোদেইদা ও তাইজ প্রদেশের সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামলা চালায় এবং উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। বৃহস্পতিবার তারা বাব আল-মান্দাবের উত্তরে অবস্থিত পমাখা বন্দরনগরী ও জুকার দ্বীপ দখল করে।
মোচা থেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে আসা ৪৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এএফপিকে বলেছেন, ঐতিহাসিক শহরটিতে তখন ‘প্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতি’ বিরাজ করছিল।
শুক্রবার ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি জানিয়েছেন, তারা তাইজ-মোচা সড়কের আশপাশের এলাকায় গোলাবর্ষণ শুরু করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এএফপিকে জানিয়েছেন, তারা বিমান হামলার শব্দ শুনেছেন।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরবও বিমান হামলা চালিয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সদর দপ্তর এডেন থেকে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
তবে এতে হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি।
হুতি-সমর্থিত গণমাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবার মোচা বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনী দুটি বিমান হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহরের সমুদ্রবন্দরে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন