প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও দলীয় পর্যায়ে বেশ কিছু বড় চুক্তি করা হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ যে এ ধরনের ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছে, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে নতুন এই সম্পৃক্ততার গতি ও বিস্তৃতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রশ্নটি হলো, —নিজস্ব কৌশল’ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ কীভাবে এর সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে পারবে?
এবারের সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক। সাধারণ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরের এ ধরনের চুক্তি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে। বেইজিংয়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রসারের অংশ হিসেবে সিপিসি তাদের আন্তর্জাতিক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। প্রবাসীদের সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়াতে দেশটির 'ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট'-এর ভূমিকার কথাও গবেষকরা তুলে ধরেছেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ কার্যরত রয়েছে এবং নতুন চুক্তির আওতায় আরও এমন কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষা, বৃত্তি এবং শিক্ষাবিনিময়ের দারুণ সুযোগ প্রদান করছে। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রতিষ্ঠান গভীর পর্যবেক্ষণের মুখেও পড়েছে।
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ’ (সিএমজি) কনটেন্ট শেয়ারিং, সাংবাদিকদের পারস্পরিক সফর এবং স্থানীয় সম্প্রচারকদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা ধারাবাহিকভাবে বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া কূটনীতিতে এমন অংশীদারত্ব সাধারণ বিষয় হলেও, এর মাধ্যমে বেইজিং বিদেশে নিজেদের বয়ান প্রচারের বিশাল সুযোগ পাচ্ছে।
চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা অবকাঠামো খাতে সমানভাবে দৃশ্যমান। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, এর কাছাকাছি প্রস্তাবিত চীনা শিল্পপার্ক এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল—বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এসব প্রকল্প দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিচালিত হলে বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা মতে, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়টিও সমান মনোযোগ দাবি করে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বার্ষিক ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে সামান্য। তাই ভবিষ্যৎ আলোচনায় শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির সমস্যা সমাধানের দিকেও জোর দিতে হবে।
এসব পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করা যাবে না। বাংলাদেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব অপরিহার্য, যেখানে চীন বড় অবদান রাখতে পারে। তবে সফল অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে।
বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতার মাঝে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী সমান স্পষ্টতা, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কিনা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন