প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একবিংশ শতাব্দীকে প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহের যুগ বলা হয়ে থাকে। মানুষের জীবন বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময়। যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণরূপে সহজ হয়ে গেছে, চিকিৎসাব্যবস্থা সার্বজনীন ভাবে উন্নত হয়েছে এবং জীবনযাত্রার মানও বেড়েছে। কিন্তু এটি বিস্ময়কর যে, বস্তুগত উন্নতির এই বাহিনীতে মানসিক অশান্তি, উদ্বেগ ও হতাশা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছে। উপরন্তু, বিশ্বের প্রতি আটজনে প্রায় একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে। হতাশা বা ডিপ্রেশন এখন বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রধান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তৃতি, একাকিত্ব, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং আত্মিক শূন্যতা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
প্রশ্ন arise যখন আমরা জানতে চাই, মানুষের মধ্যে এত অস্থিরতার কারণ কী? কেন বাহ্যিক প্রাচুর্যের মাঝেও অন্তরে শান্তি নেই? ইসলাম, মানুষের মানসিক প্রশান্তিকে ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে বিবেচনা করে। পবিত্র কোরআনে হতাশা ও নিরাশার পরিবর্তে আশা, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি আস্থার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না; যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।'(সূরা আলে ইমরান : ১৩৯)
এই আয়াত শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রের নির্দেশনা নয়; বরং এটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের মানসিক দৃঢ়তার শিক্ষা দেয়। একজন বিশ্বাসী মুমিন জানে যে, জীবনের প্রতিটি কষ্টের পেছনে আল্লাহর হিকমত আছে এবং প্রতিটি রাতের পর একটি ভোর আসে।
হতাশার একটি বড় কারণ হচ্ছে অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে, মানুষ অন্যের সফলতা দেখে, কিন্তু তার সংগ্রাম দেখা হয় না। অন্যের হাসিমুখ দেখে, কিন্তু তার কান্না দেখা হয় না। ফলে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে যে পার্থিব ভোগ-সম্পদ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি চোখ প্রসারিত করো না এবং তাদের জন্য দুঃখও করো না।'(সূরা হিজর : ৮৮)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি দুশ্চিন্তা ও বিষাদের দরজা খুলে দেয়; আর আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও নির্ভরতা অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়।
আধুনিক মানুষ প্রায়ই তাৎক্ষণিক ফলাফল চায়। সে দ্রুত সফল হতে চায়, দ্রুত ধনী হতে চায়, দ্রুত স্বীকৃতি পেতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃত অর্জনের জন্য সময়, ধৈর্য এবং অধ্যবসায় প্রয়োজন।
ইসলাম মানুষকে ধৈর্যের শিক্ষা প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা কোরআনে নবী ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে বলেন, 'অতএব উত্তম ধৈর্যই আমার অবলম্বন।'(সূরা ইউসুফ : ১৮) মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস সম্পর্কে কোরআন অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছে, 'জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।'(সূরা রা'দ : ২৮)
এটি কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয়; বরং এটি মানুষের আত্মিক প্রয়োজনের চূড়ান্ত সমাধান। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও যিকির মানুষের অন্তরে এমন এক প্রশান্তি সৃষ্টি করে, যা কোনো বস্তুগত অর্জন দ্বারা লাভ করা সম্ভব নয়।
রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'মুমিনের ব্যাপারটি বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ এলে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্ট এলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।'(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)
আজকের পৃথিবীতে অর্থের অভাবের চেয়ে প্রশান্তির অভাবই সবচেয়ে বড় সংকট। বস্তুগত উন্নতি মানুষের জীবনকে আরাম দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়কে শান্ত করতে সক্ষম নয়। হৃদয়ের প্রশান্তি আসে স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমে।
তাহলে হতাশার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা, ধৈর্য, ইতিবাচক চিন্তা, কৃতজ্ঞতা এবং নিয়মিত ইবাদত। কারণ প্রকৃত সুখ কোনো সম্পদ, পদ বা খ্যাতির মধ্যে নয়; বরং রবের সান্নিধ্য অনুভব করার মধ্যেই নিহিত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন