০৮:৪৮ পি.এম
বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি আজ আর তেহরান, মস্কো কিংবা বেইজিং করছে না; প্রশ্নটি উঠছে খোদ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেই—একটি ইরানকে মোকাবিলা করতেই যদি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সংঘাতে সামরিক চাপ, কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং মধ্যস্থতানির্ভর যুদ্ধবিরতির বাস্তবতায় পড়তে হয়, তবে বিশ্বের অপর দুই বৃহৎ পরমাণু শক্তি চীন ও রাশিয়াকে মোকাবিলা করার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি কোথায়?
দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন নিজেকে বিশ্বের একক সুপার পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই শক্তির অজেয়তার ধারণায় বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। যে যুদ্ধকে দ্রুত ও একতরফা ফলাফলের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, তা উল্টো দীর্ঘায়িত সংঘাতে রূপ নিয়ে মার্কিন কৌশলগত সক্ষমতা ও সহনশীলতার সীমা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
যুদ্ধের ইতিহাস বলে, একটি পরাশক্তি তখনই দুর্বল দেখাতে শুরু করে, যখন তার প্রতিপক্ষ তাকে সামরিকভাবে পরাজিত না করেও রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়। আজ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে সেই বাস্তবতাই। যদি একটি আঞ্চলিক শক্তিকে ঘিরেই বিশ্বশক্তিকে তার হিসাব-নিকাশ নতুন করে সাজাতে হয়, তবে বহুমেরুকেন্দ্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থায় তার একচ্ছত্র আধিপত্যের দাবি কতটা টেকসই?
চীন আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং দ্রুত সম্প্রসারিত সামরিক শক্তির অধিকারী। রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম মালিক এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। সেই দুই শক্তিকে সামনে রেখে প্রশ্ন উঠতেই পারে—যে যুক্তরাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক সংঘাতের অভিঘাত সামলাতেই বিপুল কূটনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়ে, সে কীভাবে একই সঙ্গে দুই বৃহৎ পরমাণু শক্তিকে মোকাবিলা করবে?
সামরিক শক্তির প্রকৃত পরীক্ষা যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা সামরিক বাজেটের অঙ্কে হয় না; প্রকৃত পরীক্ষা হয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ধৈর্য, অর্থনৈতিক সহনশীলতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংকল্পে। আর সেই পরীক্ষার ফল যদি বিশ্বের কাছে পরাশক্তির অজেয়তার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তবে সেটি শুধু একটি যুদ্ধের সংকেত নয়—এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।
বিশ্বরাজনীতির এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ইরানের কঠোর প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘ ৪০ দিনের সংঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়, কারণ পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে পুনরায় উত্তেজনা ও হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয় যে, গত ৪৮ ঘন্টায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের পাল্টা হামলায় কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা, বিমানঘাঁটি ও রাডার ব্যবস্থাগুলো একপ্রকার বিধ্বস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিশ্লেষণী মহলে এমন দাবিও উঠে আসে যে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল থেকে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ তথা সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ ২২ রাফটার ইসরাইল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও এসব ঘটনার মাত্রা ও প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে, তবুও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন—কঠোর নিষেধাজ্ঞায় থাকা একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতই যদি যুক্তরাষ্ট্রকে এত বড় কৌশলগত ও সামরিক চাপের মুখে ফেলে, তবে চীন ও রাশিয়ার মতো দুই বৃহৎ পরমাণু শক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক।
বিশ্ব রাজনীতির আকাশে তাই আজ একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—এক ইরানকে ঘিরেই যদি ওয়াশিংটনের কৌশলগত আত্মবিশ্বাসে ফাটল দেখা দেয়, তবে চীন ও রাশিয়ার মতো দুই পরমাণু পরাশক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমেরিকার বহুদিনের ঘোষিত বৈশ্বিক আধিপত্যের দাবির ভিত্তি আসলে কতটা শক্ত?
সুতরাং, আজকের দিনে এই প্রশ্ন মোটেও অমূলক নয়: যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সর্বাধিক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটিকে ঘিরে সংঘাতে এত বড় চাপ ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, সেই রাষ্ট্র কীভাবে একই সময়ে বিশ্বের অপর দুই বৃহৎ পরাশক্তি চীন ও রাশিয়াকে মোকাবিলা করার সক্ষমতার দাবি করে? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনের বিশ্বশক্তির নতুন ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন