প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যেন যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক চাপ, অন্যদিকে লেবানন ও ফিলিস্তিনে ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে। প্রশ্ন উঠছে, এই আগ্রাসন কি ইসরাইলকে শক্তিশালী করছে, নাকি ধীরে ধীরে তার নিজের পতনের পথই প্রশস্ত করছে?
দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে চাপে রাখার দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর, যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন পরাশক্তি ও ইসরাইল মিলে হাজার হাজার টন অস্ত্র ফেলেও যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়নি, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সামরিক শক্তি যত বড়ই হোক, যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক চাপকে উপেক্ষা করা যায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে পলায়নের পথ খুঁজছে সেখানে ইজরাইল ক্রমাগত লেবানন ও ফিলিস্তিনে হামলা চালিয়ে কি নিজের মৃত্যুর পথ বেছে নিচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্ব পরাশক্তিও যদি দীর্ঘ সংঘাতে নিজের সক্ষমতা, অস্ত্রভাণ্ডার, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হয়, যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়, পলায়নের পথ খোঁজে, তাহলে ইসরাইলের জন্যও প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে—শেষ পর্যন্ত তার ভরসা কোথায়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো এক পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে ফেলে কিংবা চলে যায়, তখন ইসরাইলের সামনে কী থাকবে, কে তাকে রক্ষা করবে?
ইসরাইলের সামনে আজ তাই শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্নও। লেবানন ও ফিলিস্তিনে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যদি একটি রাষ্ট্র নিজের চারপাশে ক্রমাগত ক্ষোভ, প্রতিরোধ ও শত্রুতার দেয়াল তৈরি করে, তাহলে সেই দেয়াল একসময় তার নিজের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ফিলিস্তিনের মাটিতে মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বসতি এবং লেবাননে বারবার সামরিক আঘাত—এসব ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি তৈরি করে না; এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষোভ ও প্রতিশোধের বীজও বপন করে। একটি রাষ্ট্র যদি নিরাপত্তার নামে অনবরত যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?
ইসরাইল হয়তো সামরিক শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে তার প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে চাইছে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো—শুধু অস্ত্র দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। সামরিক বিজয় আর রাজনৈতিক বিজয় এক বিষয় নয় বরং তা কোন কোন ক্ষেত্রে পতনের রাস্তা তৈরি করে। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পক্ষকে আঘাত করা সম্ভব হলেও মানুষের ক্ষোভ, রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক জনমতকে বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করা যায় না।
এখানেই ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তার সামরিক উপস্থিতি ও সরাসরি সম্পৃক্ততা কমিয়ে নেয়, তাহলে ইসরাইলকে নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ কোনো পরাশক্তির ওপর চিরস্থায়ীভাবে নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র তার চারপাশের অস্থিরতা মোকাবিলা করতে পারে না।
ইরানও নিশ্চয়ই তার কৌশলগত হিসাব থেকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ও লেবানন কিংবা তার মিত্র শক্তির উপর ক্রমাগত ইসরাইলের হামলার পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখছে না—কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে। ফিলিস্তিন ও লেবাননে ধারাবাহিক প্রাণহানি এবং ধ্বংসযজ্ঞ যদি চলতেই থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়, যার প্রতিশোধ ইরান না নিয়ে ছাড়বে না।
সেই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে এমনকি ইজরাইল সম্পর্কে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, ইরানের জাতীয় বীর হিসেবে এ
পরিচিত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যে কথা বলেছিলেন, "পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রটিকে মুছে দেওয়া হবে" সে পথে হাঁটতে ইরান হয়তো দ্বিতীয়বার ভাববে না।
তাই ইসরাইলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যুদ্ধের ধারাবাহিকতা নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করা। লেবানন ও ফিলিস্তিনে হামলা বন্ধ করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আলোচনার পথ খোলা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া—এটাই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তার পথ হতে পারে।
কারণ আগুন দিয়ে আগুন নেভানো যায় না।
একটি রাষ্ট্র যত বেশি আগ্রাসনের ওপর নির্ভর করবে, তত বেশি তার চারপাশে প্রতিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর সেই প্রতিরোধ যদি একদিন আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাই প্রশ্নটি আজ শুধু—ইসরাইল কতটা শক্তিশালী?
প্রশ্নটি আরও গভীর: এই শক্তি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্র যদি একসময় নিজের স্বার্থ ও নিরাপত্তার হিসাব কষে মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে, তখন ইসরাইলের সামনে বাস্তবতার কঠিন আয়না আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তখন তাকে ভাবতে হবে—চিরস্থায়ী যুদ্ধ, দখল, হামলা ও ধ্বংসের ওপর কি কোনো রাষ্ট্রের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব?
ইসরাইল যদি এখনই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না নেয়, তাহলে আজকের সামরিক সাফল্যই হয়তো আগামী দিনের কৌশলগত সংকটের বীজ হয়ে উঠতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন