প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বছরের পর বছর ধরে মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নোয়াখালীর হাতিয়ার চানন্দী, নলচিরা, সুখচর এবং চরঈশ্বর ইউনিয়নের হাজার হাজার ঘরবাড়ি।
এই পরিস্থিতিতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এখানকার কয়েক হাজার পরিবার। একসময় শুধু বর্ষাকালে এই ভাঙন দেখা যেত, তবে বর্তমানে পুরো বছর জুড়েই চলছে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। ভাঙনে ধ্বংস হচ্ছে ঘরবাড়ি, হাট-বাজার, এবং বিভিন্ন ফসলি জমি ও অন্যান্য স্থাপনা। কিছু পরিবার একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়েছে।
গৃহহীন এসব পরিবার বিভিন্ন বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কেবল আশ্বাস দিলেও গত এক যুগেরও বেশি সময়ে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সুজতী বালা মজুমদার (৬৫) বলেন, তিনি নাতি-নাতনি এবং ছেলে-বউয়ের সাথে নদীর তীরে এসেছেন। তার মুখে হাসির চিহ্ন নেই, বরং তীব্র হতাশার ছাপ ফুটে উঠেছে। রাস্তার পাশে মাটিতে বসে তিনি এক দৃষ্টে নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলেও বাড়ি যাওয়ার চিন্তা করছেন না তিনি। পারিবারিকভাবে তার স্বামী এবং সন্তানেরা নরসুন্দর পেশার সাথে জড়িয়ে আছেন। চানন্দী ইউনিয়নের ভূমিহীন বাজারের পশ্চিম পাশে নদীর তীরে তিনি রয়েছেন।
সুজতী জানান, তিনি হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে এখন এই চরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তার কাছে নগদ টাকা ছিল না। তাই ছেলে-বউদের গয়না বিক্রি করে তিনি চানন্দী ইউনিয়নের নলেরচরে ভূমিহীন বাজারের দক্ষিণ পাশে একটি জমি কিনে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু আগ্রাসী মেঘনা তার শেষ সম্বল বাড়িটি গিলে খেয়ে ফেলেছে। নতুন ঠিকানা এখনও তৈরি করতে পারেননি। নদীভাঙনে সমস্ত সহায়ক সম্বল হারিয়ে, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দুচোখে অন্ধকার দেখতে পাচ্ছেন। গত এক মাস ধরে ৮ সদস্যের পরিবারের সাথে তিনি অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। মন ভালো নেই, তাই নদীর তীরে এসেছেন নিজের শেষ স্মৃতিটুকু একবার দেখতে।
চানন্দী ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছিল ভূমিহীন বাজার। সেখানে প্রায় ৫ শতাধিক দোকান ছিল। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পাকা রাস্তার সংযোগ থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষজন এই বাজারে আসতেন। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী মমিন ভাণ্ডারি (৭০) জানান, গত এক সপ্তাহ আগে বাজারটি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে এবং ৭ দিনের মধ্যে বাজারের অর্ধেকের বেশি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অনেকেই নিজেদের শেষ সম্বলটুকু ভেঙে নিয়ে যেতে পারেননি। কেউ কেউ দোকানঘরের অংশবিশেষ খুলে গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছেন।
মমিন ভাণ্ডারি আরও জানান, তিনি ২০ বছর আগে এই চরে বসবাস শুরু করেছেন। এখন তিনি দেখছেন যে ভূমিহীন বাজার ভাঙছে। নদী এখান থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল। তবে এখন উত্তরের দিকে এই চরের আর মাত্র দুই কিলোমিটার বাকি আছে, এরপরই সুবর্ণচর উপজেলা। বিভিন্ন সময় সরকার অথবা রাজনৈতিক নেতারা কেবল আশ্বাস দিয়েছেন এবং অনেকেই এই ভাঙন নিয়ে রাজনীতি করলেও ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই চরের বাসিন্দারা এখন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বেড়িবাঁধের ঢালে আশ্রয় নিয়েছেন।
বাজারের পূর্ব পাশে এলাকাবাসীর জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল সবচেয়ে বড় মসজিদ, যেখানে দুই হাজার লোক একসাথে নামাজ পড়া সম্ভব হত। এর পাশেই ছিল গণকবরস্থান, যেখানে ৭০০–৮০০ লোককে দাফন করা হয়েছে। কবরস্থানের পাশে কিছু নারীর সাথে দেখা হয়। তাদের একজন নাজমা আক্তার (৪৫) জানান, ১০ বছর আগে তার বড় বোনকে এখানে দাফন করা হয়েছিল কিন্তু কবরস্থানটি এখন নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের গতি দেখে, তিনি মনে করছেন আগামী দু-এক দিনের মধ্যে মসজিদসহ সম্পূর্ণ কবরস্থান নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। এজন্য তিনি বোনের কবরটি শেষবারের মতো দেখতে এসেছেন।
নাজমা আরও জানান, অনেকে এখানে কবর দেওয়া স্বজনদের মৃতদেহ তুলে নিয়ে অন্যত্র দাফন করছেন। তবে একটি কবর স্থানান্তরে বিশাল পরিমাণ টাকা ব্যয় হয়, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিরূপায় হয়ে তিনি শুধু চোখে দেখতে এসেছেন।
এমন অসংখ্য অসহায়ত্ব আর হারানোর গল্প রয়েছে এই চরে বসবাসকারী হাজারো পরিবারের। গত ১৭ বছরে হাতিয়ার চানন্দী ও হরনী ইউনিয়নের অন্তত ৪০ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতি হারিয়েছে অন্তত ২০ হাজার পরিবার। সময়ের সাথে সাথে মেঘনার ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং বাজারসহ অসংখ্য স্থাপনা ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। হাতিয়ার এই দুটি ইউনিয়নে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন মৌসুমি সবজি ও মাছের চাষ হতো। এসব সবজি নোয়াখালীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলাতে সরবরাহ করা হত। কিন্তু প্রতিনিয়ত নদীভাঙনের কবলে পড়ে এখানকার মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন তাদের ঠাঁই হচ্ছে বিভিন্ন বেড়িবাঁধের পাশে।
নতুন জেগে ওঠা এই চরে মানুষের বসবাস শুরু হয় ১৯৯৮ সালের দিকে। ২০০৩ সালে একে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করা হয়। শুরুতে চানন্দী ইউনিয়ন পরিষদটি দুটি প্রশাসনিক এরিয়াতে ভাগ করে কার্যক্রম চালানো হয়— একটি কেরিংচর প্রশাসনিক এরিয়া এবং অপরটি নলেরচর প্রশাসনিক এরিয়া। পার্শ্ববর্তী সুবর্ণচর উপজেলার সাথে সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকায় তা মীমাংসা করে ২০২২ সালের ১৫ জুন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।
সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী নদীভাঙনের এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি নদীভাঙনে নিঃস্ব পরিবারগুলোর দুঃখ-কষ্টের কথা চিন্তা করে এই অঞ্চলে জরুরি কাজের পাশাপাশি স্থায়ী নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন। তিনি আরও জানান, এই অঞ্চলের নদীভাঙন রোধে একটি প্রকল্প যাচাই-বাছাই চলছে, যা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন